যে মানসিক রোগে মানুষ নিজের ক্ষতি করে

বর্ডারলাইন পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার (BPD) হলো একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যেখানে একজন ব্যক্তির আবেগীয় অস্থিতিশীলতা, সম্পর্কের সমস্যা, আত্মপরিচয়ের অস্পষ্টতা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা দেখতে পাওয়া যায়। বর্ডারলাইন পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার– এ আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই সেল্ফ-হার্ম বা নিজের ক্ষতি করার বিষয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকেন।

সেল্ফ-হার্ম-এর প্রবণতা ও কারণ

বর্ডারলাইন পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার রোগীরা আত্ম-ক্ষতির বিভিন্ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারেন। যেমন—

১. চামড়া কাটা বা ছেঁড়া।

২. নিজেকে পুড়িয়ে ফেলা।

৩. মাথা বা শরীর আঘাত করা।

৪. বিপজ্জনক বস্তু গ্রহণ করা।

৫. ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনার সৃষ্টি করা।

বর্ডারলাইন পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার– এ সেল্ফ-হার্ম সাধারণত আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে করা হয় না, বরং এটি আবেগ নিয়ন্ত্রণের একটি পদ্ধতি হিসেবে কাজ করে। কিছু সাধারণ কারণ হলো—

তীব্র আবেগ নিয়ন্ত্রণের অক্ষমতা: রাগ, হতাশা বা দুঃখ সহ্য করতে না পেরে শারীরিক ব্যথার মাধ্যমে আবেগ থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে চান।

অপরাধবোধ ও আত্ম অবমাননা: আত্মগ্লানি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অনেকে নিজেদের শাস্তি দেন।

অস্তিত্বের অনুভূতি তৈরির প্রচেষ্টা: কিছু রোগী বলেন, সেল্ফ-হার্ম করলে তারা নিজেদের ‘বাস্তব’ অনুভব করতে পারেন।

মানসিক ব্যথাকে শারীরিক ব্যথায় রূপান্তর: আবেগের কষ্ট অসহনীয় হয়ে উঠলে শারীরিক কষ্ট বেশি বাস্তব ও সহজবোধ্য মনে হয়।

লক্ষণ

১. আবেগের চরম অস্থিরতা (অল্প সময়ে হাসিকান্না বা রাগ-দুঃখের পরিবর্তন)।

২.পরিত্যক্ত হওয়ার ভয়।

৩. সম্পর্কের চরম ভঙ্গুরতা (অল্প সময়ে কাউকে অতিমূল্যায়ন বা অবমূল্যায়ন করা)।

৪. আত্ম-পরিচয় ও জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে অস্পষ্টতা।

৫. ইমপালসিভ আচরণ (মাদক গ্রহণ, বেপরোয়া ড্রাইভিং, অতিরিক্ত খরচ)।

৬. আত্মহত্যার চিন্তা বা চেষ্টা।

৭. গভীর শূন্যতার অনুভূতি।

চিকিৎসা পদ্ধতি

ডায়ালেকটিকাল বিহেভিয়োর থেরাপি (DBT): এটি বর্ডারলাইন পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার চিকিৎসার অন্যতম কার্যকর থেরাপি। এটি রোগীকে আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সহনশীলতা, মনোযোগ এবং সম্পর্ক দক্ষতা উন্নত করতে শেখায়।

কগনিটিভ বিহেভিয়োর থেরাপি (CBT): নেতিবাচক চিন্তাভাবনা পরিবর্তন এবং আবেগ সামলানোর কৌশল শেখাতে সাহায্য করে।

ওষুধ: যদিও বর্ডারলাইন পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই, তবে এন্টিডিপ্রেসেন্ট, মুড স্ট্যাবিলাইজার এবং অ্যান্টি-সাইকোটিক ওষুধ কিছু উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।

গ্রুপ থেরাপি ও সাপোর্ট গ্রুপ: রোগীকে সামাজিক সহায়তা দেয় এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের কৌশল শেখায়।

হাসপাতালে ভর্তি: যদি রোগীর আত্মহত্যার প্রবণতা তীব্র হয়, তবে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে ভর্তি করানো হতে পারে।

সেল্ফ-হার্ম (Self-harm) শুধু বর্ডারলাইন পারসোনালিটি ডিজঅর্ডারের (BPD) লক্ষণ নয়, এটি অন্যান্য মানসিক রোগের সঙ্গেও জড়িত থাকতে পারে। নিচে কিছু মানসিক রোগের তালিকা ও সেগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত সেল্ফ-হার্মের লক্ষণ দেওয়া হলো:

ডিপ্রেশন (মেজর ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডার – MDD)

লক্ষণ:

১. দীর্ঘস্থায়ী মন খারাপ, হতাশা, ও নিরাশা।

২. আত্মবিশ্বাসের অভাব ও আত্মদ্বন্দ্ব।

৩. ক্লান্তি ও জীবন নিয়ে আগ্রহ হারানো।

৪. ঘুমের সমস্যা (অনিদ্রা বা অতিরিক্ত ঘুম)।

৫. খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন (অনাহার বা অতিরিক্ত খাওয়া)।

৬. আত্মহত্যার চিন্তা বা প্রচেষ্টা।

সেল্ফ-হার্ম সম্পর্ক:

ডিপ্রেশন আক্রান্ত ব্যক্তিরা শারীরিক ব্যথার মাধ্যমে মানসিক যন্ত্রণা সাময়িকভাবে ভুলে থাকতে চান। আত্ম-অবমাননার কারণে তারা নিজেদের শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা দেখাতে পারেন।

বাইপোলার ডিজঅর্ডার

লক্ষণ:

১. ম্যানিয়া (অতি-উচ্ছ্বাস, অতিরিক্ত শক্তি, বেপরোয়া আচরণ)।

২. হতাশা (অবসাদ, আত্মহত্যার চিন্তা, আগ্রহের অভাব)।

৩. আবেগের চরম ওঠানামা।

৪. ইমপালসিভ (হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া বা বিপজ্জনক কাজ করা)।

সেল্ফ-হার্ম সম্পর্ক:

বাইপোলার ডিজঅর্ডারের বিষণ্ন পর্বে (Depressive Episode) আক্রান্ত ব্যক্তিরা তীব্র শূন্যতা অনুভব করে, যা সেল্ফ-হার্মের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আবার, ম্যানিক পর্বে ইমপালসিভভাবে বিপজ্জনক কাজ করতে পারেন।

পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (PTSD)

লক্ষণ:

১. অতীতের কোনো ট্রমাটিক ঘটনা নিয়ে দুঃস্বপ্ন বা ফ্ল্যাশব্যাক।

২. আতঙ্ক, দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা।

৩. আবেগি অনুভূতি দূর করতে চেষ্টা করা (নম্বনেস বা সংবেদনশীলতা হারানো)।

৪. সামাজিক বিচ্ছিন্নতা।

সেল্ফ-হার্ম সম্পর্ক:

পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার– এ আক্রান্ত ব্যক্তিরা অতীতের ট্রমা থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে বা অনুভূতিশূন্যতা কাটাতে সেল্ফ-হার্ম করতে পারেন।

এনোরেক্সিয়া ও বুলিমিয়া (খাদ্যজনিত ব্যাধি – Eating Disorders)

লক্ষণ:

১. খাবার এড়িয়ে চলা (Anorexia) বা অতিরিক্ত খাওয়ার পর ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করা (Bulimia)।

২. শরীর নিয়ে অতিরিক্ত সচেতনতা ও ভয়।

৩. তীব্র আত্ম-সমালোচনা।

সেল্ফ-হার্ম সম্পর্ক:

নিজের শরীর নিয়ে অসন্তুষ্টি থেকে অনেক রোগী আত্ম-শাস্তির জন্য সেল্ফ-হার্ম করেন।

সাইকোসিস ও সিজোফ্রেনিয়া

লক্ষণ:

১. বিভ্রম (Delusions) বা হ্যালুসিনেশন (ভৌতিক কণ্ঠ শোনা বা অবাস্তব দৃশ্য দেখা)।

২. বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ হারানো যুক্তিহীন ভয় বা সন্দেহ।

৩. এলোমেলো চিন্তাভাবনা ও কথা বলা।

সেল্ফ-হার্ম সম্পর্ক:

ভয়ংকর হ্যালুসিনেশন বা বিভ্রম থেকে মুক্তি পেতে অনেকে সেল্ফ-হার্ম করতে পারেন। কিছু রোগী মনে করেন, তাদের শরীরে “কিছু খারাপ” আছে, যা বের করতে হলে কাটা বা আঘাত করা দরকার।

অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজঅর্ডার (OCD)

লক্ষণ:

১. একই চিন্তা বারবার মাথায় আসা (Obsession)।

২. কিছু নির্দিষ্ট কাজ বারবার করার বাধ্যবাধকতা (Compulsion)।

৩. ভয়ানক বা নেতিবাচক চিন্তাভাবনা।

সেল্ফ-হার্ম সম্পর্ক:

অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজঅর্ডার–এ আক্রান্ত ব্যক্তিরা কিছু নেতিবাচক চিন্তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বা শাস্তিস্বরূপ নিজেদের ক্ষতি করতে পারেন।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Welcome Back!

Login to your account below

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.