মানুষের জীবনে কিছু কাজ আছে, যেগুলো সময়মতো সম্পন্ন না করলে পরে তা কষ্ট, অনুশোচনা কিংবা ফিতনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইসলাম শুধু ইবাদতের ধর্ম নয়; এটি সুন্দর, দায়িত্বশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের দিকনির্দেশনাও দেয়। তাই কিছু কাজের ক্ষেত্রে ইসলাম দেরি না করে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করেছে। মেহমানদারি থেকে শুরু করে তওবা, ঋণ পরিশোধ থেকে দাফন— এসব বিষয় মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
আসুন, কুরআন ও হাদিসের আলোকে জেনে নিই—কোন পাঁচটি কাজ দ্রুত করা উত্তম।
১. মেহমান এলে দ্রুত আপ্যায়ন করা
অতিথি আপ্যায়ন ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আদব। মেহমানকে সম্মান করা ঈমানের অংশ। কুরআনের বর্ণনায় হজরত ইবরাহিম (আ.)–এর অতিথি আপ্যায়নের প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَرَاغَ إِلَىٰ أَهْلِهِ فَجَاءَ بِعِجْلٍ سَمِينٍ
‘অতঃপর তিনি দ্রুত নিজের পরিবারের কাছে গেলেন এবং একটি মোটাতাজা বাছুর নিয়ে এলেন।’ (সুরা আয-যারিয়াত: আয়াত ২৬)
হাদিসে এসেছে—
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ
‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে।’ (বুখারি ৬১৩৬, মুসলিম ৪৭)
২. কেউ মারা গেলে দাফনে দেরি না করা
মৃত ব্যক্তিকে দ্রুত দাফন করা সুন্নাহ। অযথা বিলম্ব করা নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। হাদিসে পাকে এসেছে—
أَسْرِعُوا بِالْجَنَازَةِ
‘তোমরা জানাজা ও দাফনের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করো।’ (বুখারি ১৩১৫, মুসলিম ৯৪৪)
মৃত ব্যক্তির সম্মান রক্ষা ও তার পরকালের যাত্রা সহজ করার জন্য দ্রুত দাফনের প্রতি ইসলাম গুরুত্ব দিয়েছে।
৩. কন্যা বিবাহযোগ্য হলে দ্রুত বিবাহ সম্পন্ন করা
ইসলাম শালীনতা, পবিত্রতা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিবাহকে সহজ ও দ্রুত করার নির্দেশ দিয়েছে। হাদিসে এসেছে—
إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ
‘যখন এমন কেউ তোমাদের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, যার দ্বীন ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট, তবে তার সঙ্গে বিবাহ সম্পন্ন করো।’ (তিরমিজি ১০৮৪)
কুরআনের নির্দেশ—
وَأَنكِحُوا الْأَيَامَىٰ مِنكُمْ
‘তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিবাহ সম্পন্ন করে দাও।’ (সুরা আন-নুর: আয়াত ৩২)
৪. ঋণ থাকলে দ্রুত পরিশোধ করা
ঋণ মানুষের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে বড় দায়। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করা অন্যায়। হাদিসে পাকে এসেছে—
مَطْلُ الْغَنِيِّ ظُلْمٌ
‘সামর্থ্যবান ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করা জুলুম।’ (বুখারি ২৪০০, মুসলিম ১৫৬৪)
হাদিসে আরও এসেছে—
نَفْسُ الْمُؤْمِنِ مُعَلَّقَةٌ بِدَيْنِهِ حَتَّى يُقْضَىٰ عَنْهُ
‘মুমিনের আত্মা তার ঋণের কারণে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে, যতক্ষণ না তা পরিশোধ করা হয়।’ (তিরমিজি ১০৭৮)
৫. গুনাহ হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তওবা করা
মানুষ ভুল করবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু উত্তম হলো, ভুল বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গেই আল্লাহর কাছে ফিরে আসা। কুরআনের ঘোষণা—
وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
‘হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর, যাতে তোমরা সফল হতে পার।’ (সুরা আন-নুর: আয়াত ৩১)
হাদিসে পাকে নবীজি (সা.) বলেছেন—
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءٌ وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ
‘আদম সন্তানের সবাই ভুলকারী, আর উত্তম ভুলকারী তারা, যারা বেশি বেশি তওবা করে।’ (ইবনে মাজাহ ৪২৫১)
জীবনের কিছু কাজ আছে, যেগুলো সময়মতো সম্পন্ন করাই কল্যাণের পথ। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে—ভালো কাজে দ্রুততা এবং গুনাহ থেকে দ্রুত ফিরে আসাই একজন মুমিনের সৌন্দর্য। মেহমানকে সম্মান করা, মৃতের দাফনে বিলম্ব না করা, সন্তানদের বিবাহ সহজ করা, ঋণ দ্রুত পরিশোধ করা এবং গুনাহের পর সঙ্গে সঙ্গে তওবা করা— এসব শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনেরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আসুন, আমরা দেরির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে ইসলামের শেখানো সুন্দর ও দায়িত্বশীল জীবনের পথে নিজেদের গড়ে তুলি।






