ADVERTISEMENT

রূপালি পর্দা থেকে সিংহাসন, থালাপতি বিজয়ের এক মহাকাব্যিক উত্থান

পঁচাত্তর ঘণ্টার টানটান উত্তেজনা, হঠাৎ করে ঘোষণা বদল, আর অবিশ্বাস্য নাটকীয়তার পর শেষ পর্যন্ত স্বপ্নপূরণ হলো লক্ষ লক্ষ ভক্তের। তামিল সিনেমার সুপারস্টার সি জোসেফ বিজয়, যিনি ‘থালাপতি’ নামে বেশি পরিচিত, তিনি তামিলনাড়ুর নবম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন।একটি মাত্র দুই বছরের দল নিয়ে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ২৩৪টির মধ্যে ১০৮টি আসন পেয়ে একক বৃহত্তম দল হয়েছিলেন বিজয়। কিন্তু সরকার গঠনের জন্য দরকার ছিল ১১৮টি আসন। তার দল ছিল মাত্র ১০ আসন কম। এরপর শুরু হয় এক থ্রিলার সিনেমার চেয়েও রোমাঞ্চকর রাজনৈতিক পালাবদল।

গত পাঁচ দিন ধরে প্রতিদিন নতুন খবর আসছিল। কোনোটি বলত, ‘আগামীকাল শপথ নিচ্ছেন বিজয়’, আবার পরক্ষণেই শোনা যেত, ‘সরকার গঠনে অযোগ্য ঘোষণা করা হলো তাকে।’ ছোট বড় নানা দলের সঙ্গে জোটের টানাপড়েন চলছিল দিনরাত। শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস, ভিসিকে, সিপিআই, সিপিআইএম ও আইইউএমএলের সমর্থন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন থালাপতি বিজয়। এর মধ্য দিয়ে তামিল রাজনীতিতে দ্রাবিড়িয়ান দলগুলোর (ডিএমকে ও এআইএডিএমকে) ৬০ বছরের দীর্ঘ আধিপত্যের অবসান ঘটল।

থালাপতি বিজয়ের এই জয় সত্যিই সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। ১৯৭৪ সালে চেন্নাইয়ে জন্ম। বাবা এসএ চন্দ্রশেখর চলচ্চিত্র পরিচালক, মা শোভা চন্দ্রশেখর বিখ্যাত গায়িকা। ছোটবেলায় শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ শুরু। ১৯৯২ সালে নায়ক হিসেবে প্রথম ছবি। ৯০-এর দশকে ছিলেন রোমান্টিক নায়ক। ২০০০-এর দশকে প্রতিবাদী যুবক। আর ২০১২ সালের পর থেকে তিনি পর্দায় হয়ে ওঠেন দুর্নীতি ও ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করা সাধারণ মানুষের ‘ত্রাণকর্তা’। তার সিনেমায় থাকত দারিদ্র্য, অসমতা নিয়ে বার্তা। দর্শকের মনে গভীর দাগ কাটে। ভক্তরাই তাকে ডাকতে শুরু করেন ‘থালাপতি’ বা ‘সেনাপতি’।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি দল গঠন করেন: ‘তামিলাগা ভেট্রি কাজগম’ (টিভিকে) – মানে ‘তামিলদের জয়ের দল’। একই বছর শেষে তিনি অভিনয় থেকে অবসর নিয়ে পুরোদমে রাজনীতিতে মন দেন। কিন্তু তার আসল শক্তি আগে থেকেই তৈরি ছিল। ২০২৪ সাল নাগাদ সারা তামিলনাড়ুতে তার প্রায় ৮৫ হাজার ফ্যান ক্লাব ছিল! প্রতিটিতে কমপক্ষে ২৫ জন সক্রিয় সদস্য। মানে, রাজনীতিতে নামার আগেই তার প্রায় ২১ লাখ ২৫ হাজার কর্মী মাঠে প্রস্তুত। ‘বিজয় মাকাল ইয়াকম’ নামের এই সংগঠন আগে থেকেই রক্তদান, শিক্ষাবৃত্তি, খাদ্য বিতরণের কাজ করত। রাজনীতির ভাষায় একে বলে ‘বুথ লেভেল প্রেজেন্স’ বা ‘গ্রাউন্ড গেম’। এই জিনিস তৈরি করতে ভারতে বিজেপির মেরুদণ্ড আরএসএস-কে লেগেছে ৩০ বছর, আর খরচ হয়েছে লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু বিজয় সেটা তৈরি করে ফেলেছিলেন নায়ক থাকতেই। তাই দল গঠনের সঙ্গে সঙ্গেই তার প্রচার দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

বিজয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ডিএমকে ও এআইএডিএমকে। ডিএমকে নেতা তথা বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিন অত্যন্ত শক্তিশালী রাজনীতিবিদ। ১৯৮৯ সাল থেকে সংসদ সদস্য। একাধিকবার মন্ত্রী, এমনকি উপমুখ্যমন্ত্রী। তার বাবা করুণানিধি ছিলেন পাঁচবারের মুখ্যমন্ত্রী। নিজেও তৃণমূল থেকে উঠে আসা স্টালিনকে ডাকা হতো ‘থালাপতি স্টালিন’। সেই স্টালিনকেই হারিয়েছেন থালাপতি বিজয়।

এআইএডিএমকে গড়েছিলেন আরেক তামিল সিনেমার কিংবদন্তি এমজিআর (মারুদূর গোপালন রামচন্দ্রন)। তিনিও পর্দায় ন্যায়ের লড়াই আর গরিবের পক্ষের চরিত্রে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিলেন। সেই একই পথে হাঁটছেন বিজয়। সাধারণ তামিল মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই ডিএমকে ও এআইএডিএমকে-র দুর্নীতি ও পরিবারতন্ত্রের বাইরে বিকল্প খুঁজছিল। সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে টিভিকে।

তবে জয়ের পরেই বড় পরীক্ষা। বিজয়ের নির্বাচনি ইশতেহারে এমন কিছু প্রতিশ্রুতি রয়েছে, যা পূরণ করতে গেলে তামিলনাড়ুর অর্থনীতি দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একদিকে প্রতিশ্রুতি রাখতে না পারলে ভক্তদের জনপ্রিয়তা হারানোর ভয়, অন্যদিকে প্রতিশ্রুতি রাখলে অর্থনৈতিক সংকট। তামিল রাজনীতিতে সিনেমার নায়ক থেকে মুখ্যমন্ত্রী হওয়া নতুন কিছু নয়। কিন্তু জনপ্রিয়তা ধরে রেখে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করে জনগণের সেবা করে যাওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। থালাপতি বিজয়ের কাছে তামিল জনগণের পাহাড়সম আকাঙ্ক্ষা আদৌ পূরণ হবে কি না, সেটা সময়ই বলে দেবে।

 লেখায় : ইব্রাহিম খলিল উল্লাহ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Welcome Back!

Login to your account below

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.