চট্টগ্রাম
ই-পেপার

যে রাতে ক্রিকেটের সুপারহিরো হয়ে উঠেছিলেন ম্যাক্সওয়েল

Chittagong Live
প্রকাশ : নভেম্বর ৩, ২০২৬ ইং
অনলাইন সংস্করণ

এমন সব দৃশ্যের দেখা কেবল মেলে হলিউডি সুপারহিরো সিনেমায়। 

বিরুদ্ধ পরিস্থিতিটা ক্রমেই আরও বিরুদ্ধে যাচ্ছে, একটু একটু করে ভেটো দিয়ে বসছে শরীরও, সব মিলিয়ে পা হড়কাতে হড়কাতে এমন জায়গায় নেমে যেতে হচ্ছে যেখান থেকে ফেরা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। ঠিক তখনই সুপারহিরো সত্তাটির মাথা তুলে দাঁড়ানোর শুরু। প্রায় ‘অসম্ভব’ পরিস্থিতি থেকে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে শেষমেশ বিজয়ীর হাসি হাসা… এসব তো কেবল সিনেমার পর্দাতেই দেখা যায়!

এমনটি ভেবে থাকলে ভুল করবেন। কখনো সখনো বাস্তবের দুনিয়াতেও নেমে আসেন ‘সুপারহিরো’, যখন নেমে আসেন, তখন তারা ছাপিয়ে যান পর্দার সুপারহিরোদেরও। ২০২৩ সালে এমনই এক নভেম্বরের রাতে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে নেমে এসেছিলেন তেমনই এক সুপারহিরো, গ্লেন ম্যাক্সওয়েল।

তারও বহু আগে থেকে সুপারহিরো তকমাটা ছিল তার নামের পাশে। তার বিগ ব্যাশ দল মেলবোর্ন রেনেগেডস খেলে ‘মারভেল স্টেডিয়ামে’। সেখানে মারভেল সুপারহিরোর মতো করেই পারফর্ম করতেন তিনি; অভিকর্ষকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অবিশ্বাস্য সব ক্যাচ নিতেন, দুরূহ কোণ থেকে অবলীলায় কী সব থ্রোতে রান আউট করতেন প্রতিপক্ষকে, লেট মিডল অর্ডারে তুলতেন ঝড়। 

তবে তিনি যে সুপারহিরো, তার প্রমাণটা আসলে দিয়েছিলেন বছর তিনেক আগে, রিসিভিং এন্ডে থেকে তা টের পেয়েছিল আফগানিস্তান, প্রত্যক্ষ করেছিল গোটা বিশ্ব। তিনি যখন উইকেটে এলেন, তখন অস্ট্রেলিয়া ধুঁকছে। ২৯১ রান তাড়া করতে নেমে ৪৯ রান তুলতেই খুইয়ে বসেছে ৪ উইকেট। 

সে ম্যাচের আগেও অজিদের সেমিফাইনাল নিশ্চিত হয়নি। ম্যাচটা হেরে গেলে বসে থাকতে হতো শেষ ম্যাচের অপেক্ষায়। কে জানে বাংলাদেশ কোনো আপসেট ঘটিয়ে বসত কি না তখন! অজিরা এমন হিসাবনিকাশের অপেক্ষায় থাকতে পছন্দ করে না, অন্তত ক্রিকেটে। কিন্তু সেটাও সে রাতে এভারেস্টসম কিছুতে পরিণত হয়েছিল রীতিমতো।

ম্যাক্সওয়েল মাঠে এসে একে একে আরও ৩ সঙ্গীকে সাজঘরমুখো হতে দেখলেন। ৯১ রানে ৭ উইকেট তুলে আফগানিস্তান তখন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শেষ চারে খেলার স্বপ্নে বিভোর।

‘বিগ শো’ তার ‘শো’র শুরু করলেন ঠিক তখন। ভুল বলা হলো বোধ হয়। ২৪ আর ৩৩ রানে দুবার ‘জীবন’ পেলেন। ‘ম্যাড ম্যাক্স ফিউরি’ শুরু হলো তার একটু পরে। ওপাশে তার সঙ্গী হিসেবে আছেন প্যাট কামিন্স, গোটা ক্যারিয়ারে যার একটিও ফিফটি নেই! তাকে নিয়ে তুলতে হতো ঠিক ২০১ রান। 

পালটা আক্রমণের শুরুটা করলেন ঠিক তখন। যা করার তাকেই করতে হতো। একের পর এক চার আর ছক্কায় তাই করা শুরু করলেন। 

তবে পথটা যদি এত মসৃণ হতো, তাহলে হয়তো এত কথা হতো না। দলীয় ১৯১ রানে তার ক্র্যাম্প ধরা পড়ল। জয় থেকে যখন ৭৫ রানের দূরত্বে অস্ট্রেলিয়া, তখন বাম পা টা নাড়াতেই পারছেন না আর। 

অ্যাডাম জ্যাম্পা তখন ঠিক সীমানা দড়ির কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন, ম্যাক্সওয়েল যদি আর ইনিংসটা বড় করতে না পারেন, তখন নামবেন বলে। ম্যাক্সওয়েলের তখন উঠে যাওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি যদি উঠেই যাবেন, তাহলে আর ‘সুপারহিরো’ হলেন কী করে?

তিনি ওঠেননি। একটা একটা শট খেলেছেন, আর কুঁকড়ে যাচ্ছিলেন তীব্র ব্যথায়। শেষমেশ দলকে জিতিয়ে তবেই মাঠ ছাড়লেন। ১৮১ মিনিট আগেও যাকে অসম্ভব বলে মনে হচ্ছিল, ৩ ঘণ্টা ১ মিনিট পর সেটাই ধরা দিল বাস্তব হয়ে।

রেকর্ডবুকেও তোলপাড় ফেলে দিল এই ইনিংস। ওয়ানডে ক্রিকেট নতুন এক ইতিহাসও দেখল। প্রথমবারের মতো রান তাড়ায় ডাবল সেঞ্চুরি, অষ্টম উইকেটে সর্বোচ্চ রানের বিশ্বরেকর্ডসহ আরও কত কী!

তবে সেসব কীর্তি ছাপিয়ে তার ওই ইনিংসের মহিমা বুঝি মিশে আছে নেহায়েতই মানবীয় এক বিষয়ে, সে মানবীয় বিষয়টাকে ছাপিয়ে যাওয়ার অসামান্য মনোবলে। ওয়ানডে ইতিহাসে এর চেয়ে লম্বা ইনিংস দেখা গেছে আরও অনেকগুলো। বিশ্বকাপেই তো এরচেয়ে লম্বা ইনিংস গড়ে দেখিয়েছেন ক্রিস গেইল আর মার্টিন গাপটিল। 

কিন্তু লম্বা হলেও সেসব ইনিংস ম্যাক্সওয়েলের ওই ইনিংসের চেয়ে ‘বড়’ নয়। দল রান তাড়া করতে গিয়ে ধুঁকে মরছে, সেখান থেকে দলকে টেনে তোলা। সে পথ মাড়াতে গিয়ে নিজেও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়া। সেটাকেও জয় করা! এমন কিছু তো স্রেফ সুপারহিরোর পক্ষেই সম্ভব! ম্যাক্সওয়েল সে রাতে সুপারহিরোই বনে গিয়েছিলেন বটে! ‘ওয়ানডে ক্রিকেটের সর্বকালের সেরা ইনিংস এটি’ — সে ইনিংস শেষে নির্দ্বিধায় সে কথা স্বীকার করে নিয়েছিলেন প্যাট কামিন্স, ওয়াসিম আকরাম থেকে শুরু করে অজিদের চিরশত্রু ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইকেল ভন পর্যন্ত। সে ইনিংসের এমনই মহিমা!

সে ‘সুপারহিরো’ গেল রাতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বলেছেন। তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারটা বেশ বর্ণাঢ্য, দুটি ওয়ানডে বিশ্বকাপ জিতেছেন, একটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও আছে ঝুলিতে। একটি আইপিএল আছে, শেফিল্ড শিল্ড আছে কয়েকটি। বিশ্বকাপে দ্রুততম সেঞ্চুরি, টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ ৫টি সেঞ্চুরির রেকর্ডগুলোও নিজের করে তবেই অবসরে যাচ্ছেন বিগ শো।

উর্দু কবি গুলজার তার এক গানে লিখেছিলেন, ‘দুই চার মুহুর্তেও কখনো বহু বছরের হিসাব লেখা হয়ে যায়’। ম্যাক্সওয়েলের কীর্তি আছে অনেক। তবে সেসব ৭ নভেম্বরের ওয়াংখেড়ের সেই রাতকে ছাপিয়ে যেতে পারে না মোটেও। সুপারহিরো ম্যাক্সওয়েল ক্রিকেটের বহু বছরের হিসাব লিখে ফেলেছিলেন ১৮১ মিনিট দীর্ঘ ওই এক ইনিংসে।