সময় এত দ্রুত চলে যায় কেন, এটিকে ‘ধীর করা’ কি আদৌ সম্ভব?

এই তো সেদিন ২০২৫ সাল শুরু হলো, আর চোখের পলকেই ডিসেম্বর শেষ। মনে হয়, ২০২৫ সালটা যেন কোথাও হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। হঠাৎ করেই কেন সময় এমনভাবে দৌড়াতে শুরু করেএই প্রশ্ন প্রায় সবার মনেই ঘোরে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসলে সময় নিজে দ্রুত যায় না। বদলায় আমাদের মস্তিষ্কের সময় বোঝার ধরন।

সময় কি আমরা সত্যিই ‘অনুভব’ করি?

বিজ্ঞানীদের মতে, ‘সময় উপলব্ধি’ কথাটাই খানিকটা বিভ্রান্তিকর। রং, শব্দ বা স্বাদ আমরা অনুভব করি কারণ সেগুলো বাইরে বাস্তবভাবে উপস্থিতআলো চোখে পড়ে, শব্দ কানে আসে, স্বাদ জিভে লাগে। কিন্তু সময়ের ক্ষেত্রে এমন কোনো ‘কণা’ নেই, যেটা মস্তিষ্ক সরাসরি ধরতে পারে।

অর্থাৎ, মস্তিষ্ক সময়কে দেখে নাসময়কে অনুমান করে।

ঘড়ির কাঁটার মতো মস্তিষ্কও পরিবর্তনের হিসাব রেখে সময় আন্দাজ করে। যত বেশি ঘটনা ঘটে, যত বেশি পরিবর্তন হয়মস্তিষ্ক তত বেশি সময় পেরিয়েছে বলে ধরে নেয়।

ভয়, উত্তেজনা আর ধীর হয়ে যাওয়া সময়

এই কারণেই কোনো রোমাঞ্চকর বা ভয়ানক মুহূর্তে সময় যেন ধীরে চলে। গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্ঘটনার শিকার মানুষ প্রায়ই বলেনসবকিছু যেন ‘স্লো মোশন’-এ ঘটেছে।

এক গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ৩০ মিটার উচ্চতা থেকে জালে পড়তে দেওয়া হয়। পরে তারা জানান, সেই কয়েক সেকেন্ডের অভিজ্ঞতাকে তারা বাস্তব সময়ের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি দীর্ঘ বলে মনে করেছেন।

কারণ, ভয় বা উত্তেজনার সময় মস্তিষ্ক অতিরিক্ত মনোযোগী হয়। ফলে মুহূর্তগুলো খুব ঘন ও বিস্তারিত স্মৃতি হিসেবে জমা হয়। পরে স্মৃতির দিকে ফিরে তাকিয়ে মস্তিষ্ক ধরে নেয়সময় নিশ্চয়ই অনেক কেটেছে।

মজা করলে সময় উড়ে যায় কেন?

সময়ের আরেকটি দিক আছেবর্তমানে সময় কত দ্রুত যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

ডাক্তারের সামনে চেয়ারে বসে থাকা পাঁচ মিনিট যেন শেষই হয় না। অথচ প্রিয় কাজে ডুবে থাকলে ঘণ্টা কেটে যায় চোখের পলকে। কারণ, আমরা তখন সময়ের দিকে তাকিয়ে থাকি না।

মস্তিষ্ক যত বেশি সময়ের দিকে মন দেয়, সময় তত ধীরে চলে বলে মনে হয়। আর মন যদি অন্য কাজে ব্যস্ত থাকেকাজ হোক বা আনন্দসময় আপনাআপনি উধাও হয়ে যায়।

একঘেয়েমি সময়কে টেনে লম্বা করে দেয়, আর ব্যস্ততা সময়কে গিলে ফেলে।

দিন দীর্ঘ, বছর ছোটএর ব্যাখ্যা কী?

এই দ্বন্দ্ব থেকেই আসে পরিচিত অনুভূতিদিনগুলো কষ্টে কাটে, কিন্তু বছর শেষ হয়ে যায় দ্রুত।

শৈশবে সবকিছু নতুনপ্রথম স্কুল, প্রথম বন্ধুত্ব, প্রথম চাকরি। নতুন অভিজ্ঞতা মানেই শক্তিশালী স্মৃতি। ফলে পিছনে তাকালে মনে হয়, অনেক সময় পেরিয়েছে।

কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনে ঢুকে পড়ে রুটিনএকই অফিস, একই কাজ, একই পথ। দিন কাটে ধীরে, কিন্তু স্মৃতি জমে কম। তাই বছরের শেষে মস্তিষ্ক হিসাব কষে বলেআসলে খুব বেশি কিছু ঘটেনি। ফলে বছরটা ছোট বলে মনে হয়।

তাহলে সময় ধীর করব কীভাবে?

বর্তমানে সময় ধীর করতে চাইলে উপায় খুব সহজ এবং ভীষণ বিরক্তিকর। ট্রাফিক সিগনালে দাঁড়িয়ে থাকুন, মাথায় হাজার পর্যন্ত গুনুন।

কিন্তু বছরের শেষে যেন মনে না হয় সময় উড়ে গেলতার জন্য আলাদা কৌশল দরকার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুটি পথ আছেএক, স্মৃতি ধরে রাখা। ডায়েরি লিখুন, ছবি দেখুন, পুরোনো ঘটনা মনে করুন। স্মৃতি যত বাঁচবে, অতীতও তত দীর্ঘ হবে।দুই, নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করা।ভ্রমণ করুন, নতুন কিছু শিখুন, অচেনা পথে হাঁটুন। এমন কিছু করুন, যা ভুলে যাওয়া কঠিন। কারণ, সময়কে থামানো যায় না। কিন্তু স্মৃতিতে তাকে দীর্ঘ করা যায়।আর সে কাজটাই করলে, ডিসেম্বর এলেও আর মনে হবে নাএই তো সেদিন জানুয়ারি ছিল।

তথসূত্র: দ্য কনভারসেশন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Welcome Back!

Login to your account below

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.