অনেক বছর আগের কথা—প্রায় এক শতাব্দী আগের। তখন গ্রামবাংলায় যাতায়াতের জন্য পাকা সড়ক ছিল না, ছিল না বাস-ট্রেনের সুবিধা। ফলে মানুষকে হেঁটেই পাড়ি দিতে হতো দীর্ঘ পথ। ব্যবসায়ী ও বণিকেরা তাঁদের মালপত্র বজরায় ভরে নদীপথে এক হাট থেকে আরেক হাটে নিয়ে যেতেন। সাপ্তাহিক হাটে বেচাকেনার পর তাঁরা নতুন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতেন।কিন্তু রাতে কোথায় আশ্রয় নেবেন? এখনকার মতো বিলাসবহুল হোটেল-মোটেল, গেস্টহাউস বা রিসোর্ট তখন ছিল না। পথচারী, ব্যবসায়ী, দূরপথের যাত্রী—সবাই জমিদারদের স্থাপিত পান্থশালায় আশ্রয় নিতেন। এসব পান্থশালায় বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও থাকত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেশির ভাগ পান্থশালা হারিয়ে গেছে। তবে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার দক্ষিণ ভূষি ইউনিয়নের ডেঙ্গাপাড়া গ্রামে শতাব্দীপ্রাচীন একটি পান্থশালা এখনো কোনোমতে টিকে আছে, বহন করে চলেছে অতীতের স্মৃতিচিহ্ন।
প্রয়াত জমিদার জগৎ মোহন মহাজন খানমোহনা খালের তীরে এক প্রশস্ত পান্থশালা নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে পথিকরা ক্লান্তি দূর করে বিশ্রাম নিতে পারত। খালের অপর পারে ছিল কৃষ্ঠাখালী বাজার, যা প্রতি সোম ও শুক্রবার মানুষের পদচারণায় সরগরম থাকত। পান্থশালায় আশ্রয় নেওয়া যাত্রীদের সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে, জমিদার এর পাশেই প্রায় চার একর জায়গাজুড়ে এক বিশাল দিঘি খনন করান। এই দিঘির পানি শুধু পথিকদের তৃষ্ণা মেটাত না, বরং নানা গৃহস্থালি কাজেও ব্যবহৃত হতো।
এলাকার লোকজন বলছেন, এই খানমোহনা খাল ধরেই একসময় সওদাগরি নৌকা চলত। দূর-দূরান্তের লোকজনের যাতায়াতও ছিল এই খাল ধরে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা পণ্যের পসরা নিয়ে কর্ণফুলী নদী হয়ে বোয়ালখালী খাল, চানখালী খাল, খানমোহনা খাল ধরে নিত্য চলাচল করতেন।সময়ের বিবর্তনে এখন খানমোহনা খাল শুকিয়ে নালায় রূপ নিয়েছে। পাশের বাজারটিও আর বসে না। এখন মানুষ সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চড়ে সহজেই চার কিলোমিটার দূর পটিয়া সদরে গিয়ে নিজেদের মনমতো বাজার-সদাই করছেন। সময়ের ব্যবধানে এখন পান্থশালার প্রয়োজনও ফুরিয়ে গেছে।
জমিদার জগৎ মোহন মহাজন পান্থশালাটি নির্মাণ করেন ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে। ব্রিটিশ আমল থেকেই দক্ষিণ চট্টগ্রাম এলাকার প্রতাপশালী জমিদার ছিলেন তিনি। দূর-দূরান্ত থেকে আসা লোকজন সেই জগৎ মোহন মহাজনের পান্থশালায় বসে পানি পানসহ খাওয়া-দাওয়া করতেন। আবার পান্থশালার দোতলায় বিশ্রাম নেওয়ার ব্যবস্থাও ছিল।
কালের বিবর্তনে তাঁদের জমিদারি জায়গা-সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যায়। ১৯৪৬ সালে জগৎ মোহন মহাজন মারা যান তিন পুত্র ও দুই কন্যা রেখে।






