গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপদাহে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই হালকা ও আরামদায়ক পোশাকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। শরীরকে স্বস্তি দিতে পাতলা কাপড় পরা অনেকের কাছে প্রয়োজনীয় মনে হলেও, একজন মুসলিমের জীবন কেবল শারীরিক আরামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার প্রতিটি সিদ্ধান্তই শরিয়তের নির্দেশনার সঙ্গে যুক্ত।
ইসলামে পোশাক কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; বরং এটি লজ্জা রক্ষা, মর্যাদা সংরক্ষণ এবং তাকওয়ার বহিঃপ্রকাশ। তাই পোশাক নির্বাচনেও একজন মুমিনকে শালীনতা ও পর্দার সীমা বজায় রাখতে হয়।
পোশাকের মূল শিক্ষা: কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি
আল্লাহ তাআলা পোশাকের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন—
يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا ۖ وَلِبَاسُ التَّقْوَىٰ ذَٰلِكَ خَيْرٌ
‘হে আদম সন্তান! আমি তোমাদের জন্য পোশাক নাজিল করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান ঢেকে রাখে এবং সৌন্দর্য দান করে। আর তাকওয়ার পোশাকই সর্বোত্তম।’ (সুরা আল-আ‘রাফ: আয়াত ২৬)
আবার আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ
‘মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।’ (সুরা আন-নুর: আয়াত ৩০)
وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا
‘তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা স্বাভাবিকভাবে প্রকাশিত হয় তা ছাড়া।’ (সুরা আন-নুর: আয়াত ৩১)
গরমের পোশাক: শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি
বর্তমান সময়ে ফ্যাশনের নামে এমন অনেক পোশাক ব্যবহার করা হচ্ছে, যা এতটাই পাতলা যে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ স্পষ্ট হয়ে যায়। ইসলামের দৃষ্টিতে পোশাকের বৈধতা নির্ভর করে সতর আচ্ছাদিত থাকা এবং অশালীনতা না প্রকাশ পাওয়ার ওপর।
গরমের কারণে হালকা ও আরামদায়ক পোশাক পরা বৈধ হলেও তা যেন শালীনতার সীমা অতিক্রম না করে— এটাই ইসলামের মূল নির্দেশনা।
সতরের বিধান ও শরিয়তের সীমারেখা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَا يَنْظُرُ الرَّجُلُ إِلَى عَوْرَةِ الرَّجُلِ وَلَا الْمَرْأَةُ إِلَى عَوْرَةِ الْمَرْأَةِ
‘কোনো পুরুষ যেন অন্য পুরুষের সতরের দিকে না তাকায় এবং কোনো নারী যেন অন্য নারীর সতরের দিকে না তাকায়।’ (তিরমিজি ২৭৯৩)
পুরুষের সতর—
নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ ঢেকে রাখা ফরজ।
নারীর সতর—
> নামাজে: মুখ, হাত ও পা ছাড়া পুরো শরীর
> গায়রে মাহরামের সামনে: পুরো শরীর (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া ৫/৩২)
> অতীব প্রয়োজনে যেমন সাক্ষ্য বা জরুরি পরিস্থিতিতে কিছু অংশ প্রকাশের অবকাশ থাকতে পারে। (ফাতাওয়া শামি ১/৪০৬)
সতর্কবার্তা: অশালীন পোশাকের পরিণতি
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
صِنْفَانِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ لَمْ أَرَهُمَا… نِسَاءٌ كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ
‘জাহান্নামিদের দুই শ্রেণি… তাদের মধ্যে এক শ্রেণি হলো এমন নারী, যারা পোশাক পরেও উলঙ্গ।’ (মুসলিম ২১২৮)
অর্থাৎ এমন পোশাক যা শরীর ঢেকে রাখলেও আকৃতি প্রকাশ করে, তা ইসলামে নিন্দিত।
ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলাম যেমন আরামকে অস্বীকার করে না, তেমনি বেহায়াপনা ও অশালীনতাকেও সমর্থন করে না। বরং এটি শালীনতা ও পর্দার ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা উপহার দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ
‘হে আদম সন্তান! প্রত্যেক নামাজের সময় তোমরা তোমাদের সৌন্দর্য গ্রহণ কর।’ (সুরা আল-আ‘রাফ: আয়াত ৩১)
বাস্তব নির্দেশনা ও করণীয়—
> গরমে আরামদায়ক পোশাক পরা যাবে
> তবে তা অবশ্যই ঢিলেঢালা ও অশালীনতা-মুক্ত হতে হবে
> শরীরের গঠন স্পষ্ট হয় এমন কাপড় এড়িয়ে চলা
> ফ্যাশনের নামে বেহায়াপনা পরিহার করা
> তাকওয়া ও লজ্জাশীলতাকে প্রাধান্য দেওয়া
> দৃষ্টি সংযত রাখা ও পর্দা বজায় রাখা
আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْهُدَى وَالتُّقَى وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল হুদা ওয়াততুক্বা ওয়াল আফাফা ওয়াল গিনা।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে হেদায়েত, তাকওয়া, পবিত্রতা ও স্বচ্ছলতা প্রার্থনা করছি।’ (মুসলিম ২৭২১)
পোশাক শুধু শরীর ঢাকার মাধ্যম নয়; এটি একজন মানুষের চিন্তা, চরিত্র ও ইমানের প্রতিচ্ছবি। গরমের কষ্ট লাঘব করা প্রয়োজন হলেও তা যেন কখনোই শরিয়তের সীমা লঙ্ঘনের কারণ না হয়। প্রকৃত সৌন্দর্য কাপড়ের পাতলায় বা ফ্যাশনে নয়; বরং লজ্জাশীলতা, সংযম ও তাকওয়ার মধ্যেই নিহিত। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শালীনতা বজায় রেখে পোশাক পরার, দৃষ্টি সংযত রাখার এবং তার সন্তুষ্টিমূলক জীবনযাপনের তৌফিক দান করুন। আমিন।






