আজকাল দেখা যায়, কেউ বিপদে পড়লে অনেকে সেটিকে বিনোদনের বিষয় বানিয়ে ফেলে। কেউ চাকরি হারিয়েছে, কেউ অসুস্থ, কারও ব্যক্তিগত জীবন ভেঙে পড়েছে— এসব নিয়েই মিম, ব্যঙ্গ, কটাক্ষ। অনেকেই মন্তব্য করে— ‘এটা তো তার প্রাপ্যই ছিল!’ কিন্তু এই ধরনের আনন্দ আসলে বিষের মতো— যা ধীরে ধীরে হৃদয়কে কঠিন ও নিষ্ঠুর করে তোলে। ইসলাম এ ধরনের মানসিকতাকে সম্পূর্ণরূপে নিরুৎসাহিত করে।
এ সম্পর্কে হাদিসের সতর্কবার্তা
নবীজি (সা.) বলেছেন—
لاَ تُظْهِرِ الشَّمَاتَةَ لأَخِيكَ فَيَرْحَمُهُ اللَّهُ وَيَبْتَلِيكَ
‘তোমার কোন ভাইয়ের বিপদে তুমি আনন্দ প্রকাশ করো না। অন্যথায় আল্লাহ তা’আলা তাকে দয়া করবেন এবং তোমাকে সেই বিপদে নিক্ষিপ্ত করবেন।’ (তিরমিজি ২৫০৬)
এই হাদিস আমাদের স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দেয়— ‘অন্যের কষ্টে হাসা মানে নিজের জন্য বিপদের দরজা খুলে দেওয়া। আল্লাহ দয়ালু; তিনি দয়া করতে ভালোবাসেন। যে অন্যের প্রতি দয়া করে না, সে নিজেও দয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
কুরআনের শিক্ষা
পবিত্র কুরআনে মুমিনদের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন—
مُحَمَّدٌ رَّسُوۡلُ اللّٰهِ ؕ وَ الَّذِیۡنَ مَعَهٗۤ اَشِدَّآءُ عَلَی الۡكُفَّارِ رُحَمَآءُ بَیۡنَهُمۡ
‘মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল এবং তার সঙ্গে যারা আছে তারা কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর; পরস্পরের প্রতি সদয়’। (সুরা আল-ফাতহ: আয়াত ২৯)
আরও বলা হয়েছে—
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
‘মুমিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই।’ (সুরা আল-হুজুরাত: আয়াত ১০)
যেখানে সম্পর্ক ভাইয়ের মতো, সেখানে এক ভাইয়ের দুঃখে অন্য ভাই আনন্দিত হবে—এটা কল্পনাও করা যায় না।
‘কর্মফল’ বলে আনন্দ—ভুল দৃষ্টিভঙ্গি
অনেকে বলে, ‘ও তো খারাপ কাজ করেছে, এটা তার শাস্তি।’ কিন্তু বিচার করার মালিক একমাত্র আল্লাহ। আমরা কারও অন্তরের অবস্থা জানি না। হয়তো সেই ব্যক্তি একসময় আন্তরিক তওবা করবে, যা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় হবে।
নবীজি (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন— মৃত ব্যক্তির ভালো দিক উল্লেখ করতে, খারাপ গোপন রাখতে। তাহলে জীবিত কারও বিপদে তো আরও বেশি সংযমী হওয়া উচিত।
হিংসা—এই রোগের মূল
অন্যের বিপদে আনন্দ পাওয়ার পেছনে বড় কারণ হলো হিংসা। নবীজি (সা.) বলেছেন—
إِيَّاكُمْ وَالْحَسَدَ فَإِنَّ الْحَسَدَ يَأْكُلُ الْحَسَنَاتِ
‘তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ হিংসা নেক আমলকে খেয়ে ফেলে, যেমন আগুন কাঠকে খেয়ে ফেলে।’ (আবু দাউদ ৪৯০৩)
এই হিংসাই মানুষকে অন্যের কষ্টে আনন্দ পেতে শেখায়— যা আত্মার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
বাস্তবতার শিক্ষা
জীবনে আমরা প্রায়ই দেখি—যে অন্যের পতনে হাসে, কিছুদিন পর নিজেই একই পরিস্থিতিতে পড়ে। এটি শুধু কাকতালীয় নয়; বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি শিক্ষা।
করণীয়
অন্যের বিপদ দেখলে হাসাহাসি নয়, বরং অন্তর থেকে দোয়া করা উচিত— ‘হে আল্লাহ, তাকে হেদায়াত দিন, তার কষ্ট দূর করুন।’
একই সঙ্গে নিজের জন্যও দোয়া করা দরকার— যেন আমরা এ ধরনের বিপদ থেকে নিরাপদ থাকি। কারণ, এক মুমিনের জন্য অন্য মুমিনের দোয়া কবুল হয়।
যদি কেউ ভুল করে থাকে, তার জন্য হেদায়াতের দোয়া করাই প্রকৃত কাজ— এটাই নববী শিক্ষার সৌন্দর্য।
অন্যের কষ্টে আনন্দ পাওয়া হৃদয়ের অন্ধকারের লক্ষণ, আর সহানুভূতি হলো ঈমানের আলো। ইসলাম আমাদের শেখায়— মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়াতে, তাদের জন্য দোয়া করতে, ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে। তাই আসুন, আমরা নিজেদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করি— হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত রেখে দয়া, মমতা ও সহমর্মিতায় ভরিয়ে তুলি। আল্লাহ আমাদের অন্তরকে কোমল করুন এবং সঠিক পথে চলার তৌফিক দান করুন। আমিন।






