কুরবানি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; এটি ত্যাগ, আনুগত্য ও আল্লাহর প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক উজ্জ্বল প্রতীক। মানবজাতির ইতিহাসে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর অতুলনীয় আত্মত্যাগের স্মৃতিকে জীবন্ত রাখার জন্যই এই ইবাদতের প্রবর্তন। তাই কুরবানির মূল চেতনা কেবল পশু জবাইয়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং নিজের নফস, লোভ-লালসা ও পার্থিব আসক্তিকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ করার মধ্যেই এর প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত। কুরআন ও হাদিসে কুরবানির গুরুত্ব ও ফজিলত বারবার তুলে ধরা হয়েছে, যা প্রতিটি মুমিনের জন্য গভীর চিন্তা ও আমলের বিষয়।
কুরবানি কী?
উর্দূ ও ফার্সিতে কুরবানি শব্দটির ব্যবহার হলেও এটি করব বা কুরবান (قرب বা قربان) আরবি শব্দ থেকে উৎপত্তি হয়েছে। যার অর্থ- ‘নৈকট্য বা সান্নিধ্য’। কুরবান হলো, প্রত্যেক সেই বস্তু, যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায়। আর সেখান থেকেই ফার্সি বা উর্দু-বাংলাতে ‘কুরবানি’ শব্দটি গৃহীত হয়েছে।
আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ার আশায় জিলহজ মাসের ১০ তারিখ সকাল থেকে ১২ তারিখ সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত কুরবানির নিয়তে উট, গরু-মহিষ ও ছাগল-ভেড়া জবাই করাই হলো কুরবানি। আর এ পশুর পশম যতবেশিই হোক না কেন, প্রতিট পশমের বিনিময়ে রয়েছে একটি করে সওয়াব। হাদিসে পাকে এসেছে—
عَنْ زَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ أَصْحَابُ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَا هَذِهِ الْأَضَاحِي؟ قَالَ: سُنَّةُ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ. قَالُوا: فَمَا لَنَا فِيهَا؟ قَالَ: بِكُلِّ شَعْرَةٍ حَسَنَةٌ. قَالُوا: فَالصُّوفُ؟ قَالَ: بِكُلِّ شَعْرَةٍ مِنَ الصُّوفِ حَسَنَةٌ.
হজরত যায়েদ ইবনে আরকাম রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, সাহাবায়ে কেরাম একদিন নবীজি (সা.)কে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! (সা.) এই কুরবানি কী?
নবীজি (সা.) বললেন, ‘এটা তোমাদের পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নাত (রীতিনীতি)। তাকে আবারও জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল! (সা.) এতে আমাদের কি ফজিলত (পূণ্য রয়েছে)?
নবীজি (সা.) উত্তরে বললেন, ‘(কুরবানির জন্তুর) প্রতিটি লোমের (পশমের) পরিবর্তে (একটি করে) নেকি রয়েছে।’ তারা আবারও জিজ্ঞাসা করলেন, ’পশম বিশিষ্ট পশুর বেলায় কী হবে? (পশুর তো পশম অনেক বেশি)। নবীজি (সা.) বললেন, ‘পশমওয়ালা পশুর প্রতিটি পশমের পরিবর্তেও একটি করে নেকি রয়েছে।’ সুবহানাল্লাহ! (মুসনাদে আহমদ ১৯৩০২, ইবনে মাজাহ ৩১২৭, মিশকাতুল মাসাবিহ ১৪৭০)
কুরবানি আল্লাহর নির্দেশ
মুমিন মুসলমানের জন্য নির্ধারিত দিনে কুরবানি করা মহান আল্লাহর নির্দেশ। কুরআন-সুন্নার নির্দেশনাও তাই। আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
‘অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ পড় এবং কুরবানি কর।’ (সুরা কাউসার: আয়াত ২)
হাদিসে কুরবানির তাৎপর্য ও ফজিলত
আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে নামাজ ও কুরবানি করার নির্দেশ দিয়েছেন। নবীজি (সা.)ও এ দুটি ইবাদত সবচেয়ে বেশি করেছেন। তিনি যেমন বেশি নামাজ আদায় করেছেন তেমনি বেশি কুরবানিও করেছেন।
নবীজি (সা.)-এর কুরবানি করা প্রসঙ্গে হাদিসে একাধিক বর্ণনা রয়েছে। তাহলো—
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: ضَحَّى النَّبِيُّ ﷺ بِكَبْشَيْنِ أَمْلَحَيْنِ أَقْرَنَيْنِ، ذَبَحَهُمَا بِيَدِهِ، وَسَمَّى وَكَبَّرَ، وَوَضَعَ رِجْلَهُ عَلَى صِفَاحِهِمَا.
হজরত আনাস (রা.) বলেন, নবী (সা.) সাদা-কালো মিশ্র রঙের, শিংযুক্ত দুইটি দুম্বা কুরবানি করেন। তিনি নিজ হাতে জবাই করেন, বিসমিল্লাহ ও তাকবির বলেন এবং পা দিয়ে তাদের পাশ চেপে ধরেন।’ (বুখারি ৫৫৬৫, মুসলিম ১৯৬৬)
عَنْ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: أَقَامَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ بِالْمَدِينَةِ عَشْرَ سِنِينَ يُضَحِّي.
হজরত ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ১০ বছর মদিনায় অবস্থান করেছেন। মদিনায় অবস্থানকালীন প্রত্যেক বছরেই কুরবানি করেছেন।’ (মুসনাদে আহমদ ৫৬৬৭, তিরমিজি ১৫০৭)
সামর্থ্যবানদের মধ্যে যারা কুরবানি করে না, তাদের প্রতি তিনি এভাবে হুশিয়ারী করেছেন। হাদিসে এসেছে—
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: مَنْ وَجَدَ سَعَةً وَلَمْ يُضَحِّ، فَلَا يَقْرَبَنَّ مُصَلَّانَا.
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন— ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে।’ (মুসনাদে আহমদ ৮২৭৩, ইবনে মাজাহ ৩১২৩, মুসতাদরাক হাকেম ৩৫১৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো বছর কুরবানি থেকে বিতর থাকেননি। তিনি কর্মে দ্বারা যেমন কুরবানি করতে অনুপ্রাণিত করেছেন আবার বক্তব্য দিয়ে কুরবানির প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। হাদিসে এসেছে—
عَنْ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ ﷺ: مَنْ ذَبَحَ قَبْلَ الصَّلَاةِ فَإِنَّمَا ذَبَحَ لِنَفْسِهِ، وَمَنْ ذَبَحَ بَعْدَ الصَّلَاةِ فَقَدْ تَمَّ نُسُكُهُ وَأَصَابَ سُنَّةَ الْمُسْلِمِينَ.
হজরত বারা ইবনে আযিব (রা.) থেকে বর্ণিত— রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের আগে কুরবানি করে, সে নিজের জন্যই জবাই করে। আর যে নামাজের পর জবাই করে, তার কুরবানি পূর্ণ হয় এবং সে মুসলমানদের সুন্নাহ অনুসরণ করে।’ (বুখারি ৫৫৪৫)
মুসলিম উম্মাহ এ ব্যাপারে একমত যে, কুরবানি কুরআন-সুন্নার নির্দেশ ও পালনীয় ইবাদত। এ ব্যাপারে কারো কোনো বিরোধ নেই। তবে কুরবানি করা ওয়াজিব না সুন্নাত; এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। যে কারণে সম্পদের মালিকের জন্য অনেক ইসলামিক স্কলারগণ কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে মতামত দেন। আবার অনেক সাহাবা, তাবেঈ, তাবে-তাবেঈ এবং ইসলামিক স্কলারগণ কুরবানিকে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা বলেছেন।
অতএব, কুরবানি একজন মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব, যা তাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথে এগিয়ে নেয়। এটি শুধু একটি বার্ষিক ইবাদত নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া অর্জন এবং মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করার এক মহান শিক্ষা। আমাদের উচিত কুরবানির বাহ্যিক রূপের পাশাপাশি এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা—ত্যাগ, আন্তরিকতা ও আল্লাহভীতি—নিজ জীবনে বাস্তবায়ন করা। তাহলেই কুরবানি আমাদের জীবনে প্রকৃত কল্যাণ ও সফলতা বয়ে আনবে।






