মানবসভ্যতার ইতিহাসে সৌন্দর্যচর্চা কখনো বিলাস, কখনো সংস্কৃতি, আবার কখনো পরিচয়ের ভাষা হয়ে উঠেছে। কিন্তু ইসলাম এই স্বাভাবিক প্রবণতাকে এক বিশেষ নৈতিক দৃষ্টিকোণে পুনর্নির্মাণ করেছে যেখানে সৌন্দর্য কেবল দৃষ্টিনন্দনতার বিষয় নয়, বরং তা বিশ্বাস, শালীনতা ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
বিশেষত নারীর সাজসজ্জা প্রসঙ্গে ইসলাম যে নির্দেশনা দিয়েছে, তা একদিকে সৌন্দর্যের বৈধতাকে স্বীকার করে, অন্যদিকে তা নিয়ন্ত্রণ করে এক সুস্পষ্ট সীমারেখায়।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেন, বলুন, কে আল্লাহর সেই সৌন্দর্যকে হারাম করেছে, যা তিনি তার বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন? (সুরা আল-আরাফ ৩২)
এই আয়াত ইসলামের একটি মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করে সৌন্দর্য নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু একই সঙ্গে কুরআন মুমিন নারীদের সতর্ক করে দেয় যেন তারা নিজেদের সৌন্দর্য এমনভাবে প্রকাশ না করে, যা সমাজে অশালীনতার দ্বার উন্মুক্ত করে। (সুরা আন-নূর ৩১)
এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ইসলাম সৌন্দর্যকে অনুমোদন দেয়, তবে তা প্রদর্শনের স্বাধীনতা সীমাহীন নয়।
রাসুলুল্লাহ মুহাম্মদ সা. এই ভারসাম্যকে আরও সুস্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন। (সহিহ মুসলিম)
কিন্তু একইসঙ্গে তিনি এমন সব কাজকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন, যা আল্লাহপ্রদত্ত স্বাভাবিক আকৃতি পরিবর্তনের শামিল। বিশেষভাবে ভ্রু উপড়ে ফেলা বা তার গঠন পরিবর্তন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ লা’নত করেছেন সেই নারীদের ওপর যারা ভ্রু উপড়ে ফেলে এবং যারা তা করায়।” (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
এই হাদিসের ভিত্তিতে ইসলামী ফিকহে ভ্রু প্লাক করা যা আধুনিক প্রসাধনী সংস্কৃতির একটি প্রচলিত অংশ সাধারণভাবে হারাম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, যদি তা কেবল সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে আকৃতি পরিবর্তনের জন্য করা হয়। তবে কিছু আলেম সীমিত ব্যতিক্রমের কথা বলেছেন যদি তা অস্বাভাবিক বিকৃতি সংশোধনের প্রয়োজন হয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে নারীর সাজসজ্জার আরেকটি মৌলিক শর্ত হলো তা যেন ‘তাবাররুজ’ এ পরিণত না হয়। অর্থাৎ, এমনভাবে সৌন্দর্য প্রকাশ করা, যা পরপুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বা সমাজে ফিতনার কারণ হয় তা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ।
চার মাজহাবের ইমামরা ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম মালিক (রহ.), ইমাম শাফেয়ী (রহ.) এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) এই নীতির ওপর ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, সাজসজ্জা বৈধ, তবে তা শালীনতা, পর্দা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের সীমা অতিক্রম করতে পারে না।
এখানে আরেকটি জটিল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে, অমুসলিমদের মতো সাজসজ্জা করা বা তাদের ব্যবহৃত প্রসাধনী গ্রহণ করা কি বৈধ?
ইসলামের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো ‘তাশাব্বুহ’ বা অন্ধ অনুকরণের নিষেধাজ্ঞা। রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো জাতির অনুকরণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। (সুনান আবু দাউদ)
এই হাদিস ইসলামী স্বাতন্ত্র্যের প্রশ্নকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। কিন্তু এর প্রয়োগে সূক্ষ্মতা রয়েছে। আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন, যে সব বিষয় কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয় বা প্রতীকের অংশ, সেগুলোর অনুকরণ হারাম। যেমন, বিশেষ ধর্মীয় পোশাক, প্রতীকী সাজসজ্জা বা এমন স্টাইল, যা কোনো ভিন্ন ধর্মের পরিচয় বহন করে। তবে সাধারণ প্রসাধনী দ্রব্য যা বৈশ্বিকভাবে ব্যবহৃত হয় এবং কোনো ধর্মীয় প্রতীক বহন করে না, তা ব্যবহার করা নিষিদ্ধ নয়, শর্ত হলো তা যেন হালাল উপাদানে তৈরি হয় এবং শরীয়তের সীমা লঙ্ঘন না করে।
ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) তার বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন, নিষিদ্ধ অনুকরণ মূলত সেই ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যেখানে তা মুসলিম পরিচয়ের স্বাতন্ত্র্যকে বিলুপ্ত করে বা অন্য ধর্মের বৈশিষ্ট্যকে গ্রহণ করে। অর্থাৎ, ইসলাম শুধু বাহ্যিক আচরণ নয়, বরং পরিচয়ের প্রশ্নেও সচেতনতা দাবি করে।
স্পষ্ট করে বলা যায়, ইসলামে নারীর সাজসজ্জা কোনো অবাধ স্বাধীনতার ক্ষেত্র নয়, আবার তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধও নয়। এটি একটি নিয়ন্ত্রিত সৌন্দর্য যেখানে প্রতিটি উপাদান বিশ্বাস, শালীনতা ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে যুক্ত।
সৌন্দর্য যখন আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে, তখন তা আর কেবল প্রসাধনীতে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা হয়ে ওঠে এক নৈতিক ভাষা। ইসলাম সেই ভাষাকে পরিশুদ্ধ করতে চায়, যেখানে নারীর মর্যাদা রক্ষা পায়, সমাজের ভারসাম্য অক্ষুণ্ণ থাকে, এবং ব্যক্তি তার স্রষ্টার নির্ধারিত সীমারেখার ভেতরে থেকেই নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে।
অতএব, ইসলামের দৃষ্টিতে প্রশ্নটি কেবল ‘কীভাবে সাজব’ নয়, বরং ‘কোন সীমারেখার ভেতরে থেকে নিজেকে উপস্থাপন করব’ এই সচেতনতাই একজন মুমিন নারীর প্রকৃত সৌন্দর্যকে সংজ্ঞায়িত করে।
লেখক: শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর






