সদকায়ে জারিয়া কী? সাধারণ সদকার সঙ্গে এর পার্থক্য কী?

মানুষের জীবনে দান-সদকার গুরুত্ব ইসলামে অত্যন্ত বেশি। সামর্থ্য অনুযায়ী দান করা শুধু গরিব-দুঃখীর উপকারই করে না, বরং দাতার জন্য আখিরাতে বিপুল সওয়াবের কারণ হয়। তবে সব দানের মর্যাদা এক নয়। কিছু দান এমন আছে, যার প্রতিদান মানুষের মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে। এসব স্থায়ী কল্যাণমূলক দানকেই বলা হয় সদকায়ে জারিয়া। মুসলমানদের জন্য এটি এমন একটি নেক আমল, যার মাধ্যমে মৃত্যুর পরও সওয়াবের ধারা অব্যাহত রাখা সম্ভব।

নিচে সদকায়ে জারিয়ার সংজ্ঞা, গুরুত্ব, সাধারণ সদকার সঙ্গে পার্থক্য এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ তুলে ধরা হলো।

সদকায়ে জারিয়া কী?

সদকায়ে জারিয়া একটি আরবি শব্দ। ‘সদকা’ অর্থ দান এবং ‘জারিয়া’ অর্থ প্রবহমান বা চলমান। অর্থাৎ, এমন দান বা কল্যাণমূলক কাজ যার উপকারিতা দীর্ঘস্থায়ী এবং যার সওয়াব দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, তাকে সদকায়ে জারিয়া বলা হয়।

পৃথিবীতে ওই দান বা স্থাপনাটি যত দিন থাকবে এবং মানুষ তা থেকে উপকৃত হবে, তত দিন সদকাকারী ব্যক্তি মৃত্যুর পরও কবরে এর সওয়াব পেতে থাকবেন।

মৃত্যুর পর যে তিন আমল জারি থাকে

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন—

 إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثٍ: صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ

‘মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, কেবল তিনটি আমল ছাড়া— সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা থেকে মানুষ উপকৃত হয় এবং এমন নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।’ (মুসলিম ১৬৩১)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সদকায়ে জারিয়া এমন একটি আমল যার সওয়াব মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে।

সাধারণ সদকা ও সদকায়ে জারিয়ার পার্থক্য

অনেকেই সাধারণ সদকা এবং সদকায়ে জারিয়াকে এক মনে করেন। কিন্তু এই দুইয়ের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো স্থায়িত্ব ও উপকারের ধারাবাহিকতা।

সাধারণ সদকা—

কাউকে খাবার খাওয়ানো বা নগদ অর্থ দান করা সাধারণ সদকার অন্তর্ভুক্ত। এসব দানের সওয়াব তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায় এবং তা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ, তবে এগুলো সদকায়ে জারিয়া নয়।

সদকায়ে জারিয়া—

এতিমখানা, মাদ্রাসা বা বৃদ্ধাশ্রমের জন্য স্থায়ী ঘর নির্মাণ করে দেওয়া সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত। যত দিন মানুষ ওই স্থাপনা ব্যবহার করবে, তত দিন দাতার আমলনামায় সওয়াব লেখা হতে থাকবে। অর্থাৎ এর সওয়াব চলমান থাকে।

সদকায়ে জারিয়ার সেরা ১০টি উদাহরণ—

নিজের বা মৃত আত্মীয়স্বজনের নামে সদকায়ে জারিয়া করতে চাইলে নিচের কাজগুলো করা যেতে পারে—

১. মসজিদ নির্মাণ

মসজিদ নির্মাণ করা বা নির্মাণাধীন মসজিদে অর্থ সহায়তা করা সদকায়ে জারিয়ার অন্যতম উত্তম মাধ্যম।

২. বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা

তৃষ্ণার্ত মানুষের জন্য নলকূপ, কূপ বা পানির ট্যাংক স্থাপন করে দেওয়া স্থায়ী সদকার অন্তর্ভুক্ত।

৩. জ্ঞান প্রচার

দ্বীনি বই, কুরআন মাজিদ বা উপকারী জ্ঞানসমৃদ্ধ বই ছাপিয়ে বিতরণ করা দীর্ঘস্থায়ী সওয়াবের কাজ।

৪. গাছ লাগানো

ফলদ বা বনজ বৃক্ষরোপণ করলে মানুষ ও পশুপাখি যত দিন তা থেকে উপকৃত হবে, তত দিন সওয়াব পাওয়া যাবে।

৫. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা

মাদ্রাসা বা স্কুল প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে দীর্ঘদিন মানুষ জ্ঞান অর্জন করবে, সেটিও সদকায়ে জারিয়া।

৬. চিকিৎসাসেবা প্রদান

হাসপাতাল নির্মাণ বা স্থায়ী চিকিৎসা সরঞ্জাম—যেমন অ্যাম্বুলেন্স বা অক্সিজেন সিলিন্ডার—দান করাও সদকায়ে জারিয়া।

৭. কবরস্থানের জমি দান

কবরস্থানের জন্য জমি কেনা বা দাফনকার্যে সহায়তা করা স্থায়ী সদকার অন্তর্ভুক্ত।

৮. রাস্তা বা সরাইখানা নির্মাণ

মুসাফিরদের জন্য বিশ্রামাগার বা মানুষের চলাচলের জন্য রাস্তা নির্মাণ করে দেওয়া।

৯. খাল বা নদী খনন

চাষাবাদ বা মানুষের প্রয়োজনের জন্য পানির নহর বা খাল খনন করা দীর্ঘস্থায়ী উপকারের কাজ।

১০. রক্তদান

মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচাতে রক্ত দান করাও একটি মহৎ সদকা।

সদকা কবুল হওয়ার শর্ত

সদকা কবুল হওয়ার প্রধান শর্ত হলো ইখলাস বা আন্তরিকতা। দান-সদকা লোক দেখানো বা প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে করা উচিত নয়; বরং কেবল মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা উচিত। লোকদেখানো দান অনেক সময় সওয়াবের পরিবর্তে গুনাহের কারণ হতে পারে।

মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু নেক আমলের প্রতিদান স্থায়ী হতে পারে। সদকায়ে জারিয়া এমন একটি মহৎ ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে একজন মুসলমান মৃত্যুর পরও সওয়াব অর্জনের সুযোগ পান। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী স্থায়ী কল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সদকায়ে জারিয়ার মাধ্যমে আমরা শুধু মানুষের উপকারই করি না, বরং নিজের আখিরাতের জন্য চিরস্থায়ী পাথেয়ও সংগ্রহ করি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Welcome Back!

Login to your account below

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.