রমজান মাস মুসলমানের জন্য আত্মসংযম, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির এক মহামূল্যবান প্রশিক্ষণ। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও যাবতীয় রোজা ভঙ্গের কারণ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে একজন মুমিন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করেন। তাই রোজার সময় কোন কাজটি বৈধ, কোনটি মাকরুহ আর কোনটি রোজা ভঙ্গের কারণ—এসব বিষয়ে সচেতন থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে আমাদের সমাজে একটি বিষয় প্রায়ই আলোচনায় আসে— রোজা রেখে খাবার চেখে দেখা যাবে কিনা। রান্নাবান্নার সময় লবণ বা স্বাদ ঠিক আছে কিনা, তা দেখার প্রয়োজন অনেকেরই পড়ে, বিশেষত গৃহিণী বা রান্নার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের। এ কারণে অনেকেই দ্বিধায় থাকেন, খাবার চেখে দেখলে রোজা ভেঙে যাবে কিনা, কিংবা এর শরয়ি বিধান কী।
রোজা অবস্থায় খাবার চেখে দেখার বিধান
ফুক্বাহায়ে কেরামরা বলেন, রোজা অবস্থায় বিনা প্রয়োজনে খাবার চেখে দেখা মাকরুহ। তবে চাকরি বাঁচানো, স্বামীর অসন্তুষ্টি এড়ানো বা অনিবার্য প্রয়োজনের ক্ষেত্রে চেখে দেখলে রোজা ভাঙবে না।
এ বিষয়ে সাহাবি ও তাবেয়িদের আমল থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়।
১. হজরত আয়েশা (রা.)-এর আমল
বিশিষ্ট তাবেয়ি হজরত মাসরুক (রহ.) বলেন—
كُنْتُ أَنَا وَرَجُلٌ عِنْدَ عَائِشَةَ يَوْمَ عَرَفَةَ، فَدَعَتْ بِشَرَابٍ فَوُضِعَ بَيْنَ أَيْدِينَا، فَقَالَتْ: لَوْلَا أَنِّي صَائِمَةٌ لَذُقْتُهُ
‘আমি ও এক ব্যক্তি আরাফার দিন হজরত আয়েশা (রা.)-এর কাছে ছিলাম। তিনি আমাদের জন্য পানীয় আনতে বললেন। পানীয় আনা হলে তিনি বললেন, ‘আমি যদি রোজাদার না হতাম, তবে অবশ্যই এর স্বাদ গ্রহণ করতাম।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা ৯২৮২)
এ বর্ণনা থেকে বোঝা যায়—রোজা অবস্থায় স্বাদ গ্রহণের বিষয়টি সংবেদনশীল এবং অপ্রয়োজনে তা থেকে বিরত থাকাই উত্তম।
২. হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বক্তব্য
তিনি বলেন—
لَا بَأْسَ أَنْ يَذُوقَ الْقِدْرَ أَوِ الشَّيْءَ
‘পাতিলের খাবার বা কোনো কিছু চেখে দেখতে অসুবিধা নেই।’ (বুখারিতে তালিক আকারে উল্লেখিত)
আরেক বর্ণনায় তাবেয়ি আতা ইবনে আবি রাবাহ (রহ.) ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন—
لَا بَأْسَ أَنْ يَذُوقَ الْخَلَّ أَوِ الشَّيْءَ مَا لَمْ يَدْخُلْ حَلْقَهُ
‘রোজা অবস্থায় সিরকা বা অনুরূপ কিছু চেখে দেখতে অসুবিধা নেই, যতক্ষণ না তা গলায় প্রবেশ করে।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা ৯২৭২)
মূলনীতি কী?
রোজা ভঙ্গের আসল কারণ হলো—খাদ্য বা পানীয় গলা বা অন্য কোনো পথে পেটে প্রবেশ করা। যেভাবেই প্রবেশ করুক, রোজা ভেঙে যাবে।
যেহেতু স্বাদ গ্রহণের সময় পেটে কিছু প্রবেশ করানো উদ্দেশ্য নয়, তাই সতর্ক থাকলে রোজা ভাঙে না। তবে—
> স্বাদ গ্রহণের পর সঙ্গে সঙ্গে তা ফেলে দিতে হবে।
> মুখের লালা ও খাবারের অংশ বের করে দিতে হবে।
> প্রয়োজনে কুলি করে নিতে হবে।
অসতর্কতাবশত গলায় চলে গেলে করণীয়
১. ভুলবশত খাবার পেটে চলে গেলে
> রোজা ভেঙে যাবে। তবে ইচ্ছাকৃত নয় বলে কাফফারা লাগবে না।
> ওই দিনের বাকি সময় না খেয়ে থাকতে হবে।
> রমজানের পরে একটি রোজা কাজা আদায় করতে হবে।
২. ইচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেললে
> রোজা ভেঙে যাবে।
> কাজা ও কাফফারা উভয়ই ওয়াজিব হবে।
ফিকহি কিতাবসমূহের সূত্র: এ বিষয়ে বহু নির্ভরযোগ্য ফিকহি গ্রন্থে আলোচনা রয়েছে, যেমন— কিতাবুল আছল (২/১৫৫), বাদায়েউস সানায়ে (২/২৫৮), খিজানাতুল আকমাল (১/৩০০), ফাতাওয়া ওয়ালওয়ালিজিয়া (১/২২৪), আলমুহিতুল বুরহানি (৩/৩৬৬), খুলাসাতুল ফাতাওয়া (১/২৫৮), রদ্দুল মুহতার (২/৪০৫), মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা (৯৩৮৫), ফাতাওয়ায়ে খানিয়া (১/২০৪), আলমুহিতুল বুরহানি (৩/৩৫৬), আততাজনিস ওয়ালমাজিদ (২/৪৮), আলবাহরুর রায়েক (২/২৭৯), তাবয়িনুল হাকায়েক (২/১৮৪), ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া (১/১৯৯)।
রোজা হলো সংযম ও তাকওয়ার শিক্ষা। তাই অপ্রয়োজনে খাবার চেখে দেখা থেকে বিরত থাকাই উত্তম। তবে প্রয়োজন দেখা দিলে, সতর্কতার সঙ্গে স্বাদ গ্রহণ করা জায়েজ—যতক্ষণ না তা গলায় প্রবেশ করে। রোজার পবিত্রতা রক্ষা করা যেমন ফরজ, তেমনি শরিয়তের সহজতাকেও উপলব্ধি করা জরুরি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে রোজা আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।






