নিয়মিত কী পরিমাণ চুল পড়া স্বাভাবিক? সতর্ক হবেন কখন?

বালিশে, বাথরুমের নর্দমার মুখে কিংবা চুলে চিরুনি চালালেই যদি গোছা গোছা চুল চোখে পড়ে, তাহলে বিষয়টি সহজে উপেক্ষা করা যায় না। মাথায় হাত দিলেই চুল উঠে এলে বিরক্তির সঙ্গে সঙ্গে মনে বাসা বাঁধে ভয় আর দুশ্চিন্তা। বারবার মনে প্রশ্ন আসে— এই চুল পড়া কি থামবে? সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে তো?

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, চুল পড়া মানেই সব সময় খারাপ কিছু নয়। বরং নির্দিষ্ট পরিমাণ চুল পড়া শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ এবং এটি সুস্থ থাকারই লক্ষণ। তাহলে কোন পরিস্থিতিতে চুল পড়া স্বাভাবিক, আর কখন তা অবহেলা করা ঠিক নয়— এই পার্থক্য বোঝা জরুরি।

চুল পড়া বোঝার আগে জেনে নিন চুল বৃদ্ধির চক্র

চুল পড়া স্বাভাবিক নাকি চিন্তার— তা বুঝতে হলে আগে চুলের বৃদ্ধির সম্পূর্ণ চক্রটি জানা প্রয়োজন। মানুষের মাথার ত্বকের প্রতিটি চুল স্বাভাবিকভাবে তিনটি ধাপের মধ্য দিয়ে যায়। এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক।

অ্যানাজেন বা বৃদ্ধির পর্যায়

অ্যানাজেন হলো চুলের সক্রিয় বৃদ্ধির ধাপ। এই সময় মাথার ত্বকের প্রায় ৮৫–৯০ শতাংশ চুল বৃদ্ধি পায়। এ পর্যায়ে হেয়ার ফলিকল জীবন্ত ও সক্রিয় থাকে এবং নতুন কোষ দ্রুত তৈরি হয়। সাধারণত এই ধাপ ২ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। স্বাস্থ্যকর চুলের ক্ষেত্রে মাথার মোট ৮০–৯০ শতাংশ চুল এই অ্যানাজেন পর্যায়েই থাকে। এই সময় চুল দ্রুত লম্বা হয় এবং ঘনত্ব বাড়ে।

ক্যাটাজেন পর্যায়

ক্যাটাজেন হলো চুল বৃদ্ধির চক্রের রূপান্তর ধাপ। এই পর্যায়ে অ্যানাজেন শেষ হয়ে চুল ধীরে ধীরে বিশ্রামের দিকে এগোয়। চুলের কোষ বিভাজন বন্ধ হয়ে যায় এবং ফলিকল সংকুচিত হতে শুরু করে। এই ধাপটি খুবই স্বল্প সময়ের—সাধারণত ২ থেকে ৩ সপ্তাহ স্থায়ী হয়। মাথার মোট চুলের মাত্র ১–২ শতাংশ এই পর্যায়ে থাকে।

টেলোজেন পর্যায়

টেলোজেন হলো চুলের বিশ্রাম ও ঝরে যাওয়ার ধাপ। এই সময় ফলিকল সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকে এবং পুরোনো চুলের গোড়া ধীরে ধীরে আলগা হয়ে যায়। এই পর্যায় সাধারণত ২ থেকে ৪ মাস স্থায়ী হয়। টেলোজেন পর্যায় শেষ হলে পুরোনো চুল পড়ে যায় এবং আবার নতুন একটি চুল বৃদ্ধির চক্র শুরু হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন স্বাভাবিকভাবে ৫০ থেকে ১০০টি চুল পড়া এই টেলোজেন পর্যায়েরই অংশ এবং একেবারেই স্বাভাবিক।

কেন চুল ঝরে পড়ে?

ঋতু পরিবর্তনের সময়, বিশেষ করে শরৎ ও বসন্তকালে, অনেকেই চুল পড়া বাড়তে দেখেন। দিনের আলোর তারতম্য, তাপমাত্রার পরিবর্তন এবং পরিবেশগত চাপ চুলের ফলিকলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে সাময়িকভাবে চুল ঝরে পড়ার প্রবণতা বেড়ে যায়।

এ ছাড়া হরমোনের ওঠানামাও চুল পড়ার একটি বড় কারণ। গর্ভাবস্থা, প্রসব-পরবর্তী সময়, মেনোপজ কিংবা থাইরয়েডজনিত সমস্যা চুলকে দ্রুত টেলোজেন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।

মানসিক চাপ ও জীবনযাত্রা

শারীরিক বা মানসিক চাপ চুল বৃদ্ধির স্বাভাবিক চক্রকে ব্যাহত করে। এর ফলে টেলোজেন পর্যায়ের পর নতুন চুল গজানো থেমে যেতে পারে। এই অবস্থাকে বলা হয় টেলোজেন এফ্লুভিয়াম।

গুরুতর অসুস্থতা, অস্ত্রোপচার, শারীরিক আঘাত কিংবা দীর্ঘদিনের মানসিক উদ্বেগের কারণে চুল পড়ার হার হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি সাধারণত সাময়িক।

শরীর যে অসুস্থতার কারণে এই সমস্যা তৈরি হয়, তা কাটিয়ে উঠলে চুল বৃদ্ধির চক্র আবার সক্রিয় হয়। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পুষ্টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আয়রন, ভিটামিন ডি কিংবা প্রোটিনের ঘাটতি চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে ব্যাহত করতে পারে।

কখন সতর্ক হওয়া প্রয়োজন?

চুল পড়া যদি সারা বছর ধরেই চলতে থাকে, তবে তা চিন্তার বিষয়। মাথার ত্বকে যদি প্যাচ, প্রদাহ, কিংবা নতুন চুল গজানোর হার কমে যেতে দেখা যায়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।

এছাড়া চুল পড়ার সঙ্গে যদি অতিরিক্ত ক্লান্তি, ওজনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা ত্বকের সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। অনেক সময় এগুলো কোনো বড় শারীরিক সমস্যার লক্ষণও হতে পারে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Welcome Back!

Login to your account below

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.