আমরা সবাই জান্নাত চাই। চাই এমন এক জায়গা— যেখানে থাকবে না কোনো কষ্ট, দুঃখ ও ভয়। কিন্তু অনেক সময় মনে হয়— ‘জান্নাত বুঝি খুব কঠিন আমলের বিনিময়ে পাওয়া যায়। অথচ বাস্তবতা হলো— আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত দয়ালু। তিনি বান্দার জন্য জান্নাতের পথকে সহজ করে দিয়েছেন। এমন কিছু আমল দিয়েছেন, যেগুলো করতে না লাগে শক্ত শরীর, না লাগে বড় বিদ্যা— লাগে শুধু খাঁটি নিয়ত আর সামান্য চেষ্টা।
আজ আমরা জানব— জান্নাত পাওয়ার এমন তিনটি সহজ আমল, যেগুলো নিয়মিত করলে আখেরাতের পথ আলোকিত হয়ে ওঠবে। তাহলো—
১. প্রতিবার ওজুর পর কালিমা শাহাদাত পড়া
হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘যে ব্যক্তি সুন্দরভাবে ওযু করার পর বলে—
أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ وَاجْعَلْنِي مِنَ الْمُتَطَهِّرِينَ
উচ্চারণ: আশহাদু আললাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু ওয়া আশহাদু আন্ন মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু, আল্লাহুম্মাঝআলনি মিনাত তাওয়্যাবিনা ওয়াঝআলনি মিনাল মুতাত্বহহিরিন।’
অর্থ: ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তার কোনো শরিক নেই; আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি নবী (সা.) তার বান্দাহ ও তারই রাসুল; হে আল্লাহ! আমাকে তাওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত কর এবং আমাকে পবিত্রতা অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত কর।’
فُتِحَتْ لَهُ ثَمَانِيَةُ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ يَدْخُلُ مِنْ أَيِّهَا شَاءَ
তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেওয়া হবে। সে নিজ ইচ্ছামত যে কোনো দরজা দিয়েই তাতে যেতে পারবে।’ (নাসাঈ ১৪৮, তিরমিজি ৫৫, ইবনু মাজাহ ৪৭০)
২. প্রতিবার ফরজ নামাজের পর একবার আয়াতুল কুরসি পড়া
নিয়মিত আমল করলে আমলকারী ও জান্নাতের মধ্যে পার্থক্য থাকে শুধুমাত্র মৃত্যু। অর্থাৎ মৃত্যু হলেই জান্নাতি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ قَرَأَ آيَةَ الْكُرْسِيِّ دُبُرَ كُلِّ صَلَاةٍ مَكْتُوبَةٍ لَمْ يَمْنَعْهُ مِنْ دُخُولِ الْجَنَّةِ إِلَّا الْمَوْتُ
‘যে কেউ আয়াতুল কুরসি প্রত্যেক ফরজ নামাজের পরে পাঠ করলে তার মৃত্যুই তার জন্য জান্নাতে প্রবেশ করার জন্য বাধা হয়ে আছে।’ (বুলুগুল মারাম ৩২৬)
আয়াতুল কুরসি
اَللّٰهُ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَۚ اَلۡحَیُّ الۡقَیُّوۡمُ ۬ۚ لَا تَاۡخُذُهٗ سِنَۃٌ وَّ لَا نَوۡمٌ ؕ لَهٗ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ مَا فِی الۡاَرۡضِ ؕ مَنۡ ذَا الَّذِیۡ یَشۡفَعُ عِنۡدَهٗۤ اِلَّا بِاِذۡنِهٖ ؕ یَعۡلَمُ مَا بَیۡنَ اَیۡدِیۡهِمۡ وَ مَا خَلۡفَهُمۡ ۚ وَ لَا یُحِیۡطُوۡنَ بِشَیۡءٍ مِّنۡ عِلۡمِهٖۤ اِلَّا بِمَا شَآءَ ۚ وَسِعَ كُرۡسِیُّهُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضَ ۚ وَ لَا یَـُٔوۡدُهٗ حِفۡظُهُمَا ۚ وَ هُوَ الۡعَلِیُّ الۡعَظِیۡمُ
আয়াতুল কুরসির বাংলা উচ্চারণ
‘আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল ক্বাইয়্যুমু লা তা’খুজুহু সিনাতুও ওয়ালা নাওম। লাহু মা ফিসসামাওয়াতি ওয়া মা ফিল আরদ্বি মান জাল্লাজি ইয়াশফাউ ইনদাহু ইল্লা বিইজনিহ। ইয়া’লামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়া মা খালফাহুম ওয়ালা ইউহিতুনা বিশাইয়্যিম মিন ইলমিহি ইল্লা বিমা শাআ ওয়াসিআ কুরসিইয়্যুহুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বি ওয়ালা ইয়াউদুহু হিফজুহুমা ওয়া হুওয়াল আলিয়্যুল আজিম।’
আয়াতুল কুরসির বাংলা অর্থ
‘আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী। তাকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না ও নিদ্রাও নয়। আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে, সবকিছু তারই। কে আছে এমন যে তার কাছে তার অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করবে? তাদের সামনে কী আছে ও পিছনে কী আছে সবই তিনি জানেন এবং তিনি যা ইচ্ছা করেন তা ছাড়া তারা তার জ্ঞানের কিছুই আয়ত্ব করতে পারে না। তার কুরসি আকাশ ও পৃথিবীকে পরিবেষ্টিত করেছে এবং সেগুলো সংরক্ষণ করতে তার কষ্ট হয় না। এবং তিনিই সর্বোচ্চ ও মহান।
৩. আজানের উত্তর দেওয়া
মনোযোগী হয়ে, আন্তরিক বিশ্বাসের সঙ্গে আজানের উত্তর দেওয়া। যে ব্যক্তি আন্তরিক বিশ্বাসের সঙ্গে আজানের উত্তর দেয়, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِذَا قَالَ الْمُؤَذِّنُ اللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ فَقَالَ أَحَدُكُمُ اللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ فَإِذَا قَالَ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ . قَالَ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ . فَإِذَا قَالَ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ قَالَ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ ثُمَّ قَالَ حَىَّ عَلَى الصَّلَاةِ قَالَ لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللهِ ثُمَّ قَالَ حَىَّ عَلَى الْفَلَاحِ قَالَ لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللهِ ثُمَّ قَالَ اللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ قَالَ اللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ ثُمَّ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ مِنْ قَلْبِهِ دَخَلَ الْجَنَّةَ
‘তোমাদের কেউ যদি মুয়াজ্জিনের আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার-এর জওয়াবে আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার বলে এবং আশহাদু আল্-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর জওয়াবে আশহাদু আল্-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে এবং আশহাদু আন্না মুাহম্মাদার রাসুলুল্লাহ এর জওয়াবে আশহাদু আন্না মুাহম্মাদার রাসুলুল্লাহ বলে। অতঃপর হাইয়্যা আলাস্-সলাহ-এর জওয়াবে যদি লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ বলে। তারপর হাইয়্যা আলাল-ফালাহ-এর জওয়াবে যদি লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ বলে। তারপর যদি আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার-এর জওয়াবে আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার এবং লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর জওয়াবে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে তাহলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (আবু দাউদ-৫২৭, মিশকাত ৬৫৮)
জান্নাত কোনো কল্পনার জায়গা নয়— এটি আল্লাহর প্রতিশ্রুতি। আর সেই প্রতিশ্রুতির দরজা খুলে যায় ছোট কিন্তু আন্তরিক আমলের মাধ্যমে। হয়তো আমরা বড় বড় ইবাদতে দুর্বল, কিন্তু এই সহজ আমলগুলো করার সুযোগ এখনো আমাদের হাতে আছে। আজ থেকে যদি এ আমলগুলো শুরু করি, হয়তো আল্লাহ আমাদের নাম লিখে দেবেন জান্নাতিদের তালিকায়।
আসুন, দোয়া করি— ‘হে আল্লাহ, আমাদের অল্প কিন্তু কবুলযোগ্য আমলের তাওফিক দিন। আমাদের জীবনকে এমন আমলে ভরে দিন, যা আমাদের জান্নাতের কাছাকাছি নিয়ে যায়।’ আমিন।






