ADVERTISEMENT

চট্টগ্রামের এক স্বপ্নবাজ তরুণের পুলিশি যাত্রা

জীবনের পথ কখনোই সহজ ছিল না আরিফ হোসাইনের জন্য। চট্টগ্রাম মহানগর এলাকার চান্দগাঁও থানাধীন ওমর আলী মাতব্বর এলাকায় এক সাধারণ মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া এই তরুণ ছোটবেলা থেকেই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন। বাবা মৃত আবদুল খালেক পেশায় ছিলেন গাড়িচালক ও মাতা খায়রুন নিছা গৃহিণী। পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে আরিফ হোসাইন চতুর্থ। পরিবারে আর্থিক টানাপোড়েন, শিক্ষাজীবনে নানা প্রতিবন্ধকতা সবকিছু মিলিয়েই তার জীবন ছিল চ্যালেঞ্জে ভরা।

তবে এক জিনিস কখনো বদলায়নি তার স্বপ্ন। দেশের মানুষের সেবা করা, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো এবং একজন সৎ পুলিশ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ছিল তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।পথটা ছিল অনেক কঠিন। পুলিশে যোগদানের জন্য কঠোর শারীরিক পরীক্ষা, মানসিক চাপ, দারিদ্র্যের বোঝা, সমাজের বাঁকা কথা সবই তাকে থামিয়ে দেওয়ার মতো ছিল। কখনো কখনো হাল ছেড়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। বরং প্রতিদিন নিজেকে নতুন করে প্রস্তুত করেছেন। ভোরবেলা দৌড়, গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশোনা, আর আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস এসবই তাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছে।

২০১৭ সাল আরিফ হোসাইনের জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ বছর। একদিকে তাঁর এইচএসসি পরীক্ষা, অন্যদিকে বাংলাদেশ পুলিশের নিয়োগ পরীক্ষা। দুইটা পরীক্ষার সময় এতটাই কাছাকাছি ছিল যে, একসাথে দুটো যুদ্ধ লড়তে হয়েছে তাঁকে।

পুলিশ হওয়ার স্বপ্নটা তিনি পরিবারকে জানাননি। কারণ পরিবার বিশ্বাস করত, সরকারি চাকরি পেতে হলে অনেক টাকা ঘুষ দিতে হয়, যা তাদের সামর্থ্যের বাইরে। কিন্তু আরিফ বিশ্বাস করতেন স্বপ্ন যদি সত্যি হয়, পরিশ্রম আর সততার মাধ্যমে সেটি একদিন বাস্তব হবেই।

টাকার অভাবে পরীক্ষার দিনগুলো তাঁর কাছে ছিল ভীষণ কষ্টকর। টানা পাঁচ দিন দুপুরে না খেয়ে শুধু পানি খেয়ে পরীক্ষা দিয়েছেন তিনি। ক্ষুধায় শরীর দুর্বল হয়ে পড়লেও, মনোবল ছিল অটুট। সেই মনোবলই তাঁকে টিকিয়ে রেখেছিল।

পরীক্ষার আরেকটি কঠিন স্মৃতি ছিল যাতায়াত। নিউমার্কেট থেকে হালিশহরে পরীক্ষার ভেন্যুতে পৌঁছাতে হলে ভাড়া দরকার ছিল। কিন্তু পকেটে এক টাকাও ছিল না। তাই প্রখর রোদ মাথায় নিয়ে তিনি পায়ে হেঁটেই হালিশহরে পৌঁছেছিলেন। প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল যন্ত্রণাময়, কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপই তাঁকে স্বপ্নের কাছে নিয়ে যাচ্ছিল।

অবশেষে সব বাধা জয় করে আরিফ হোসাইন পরিবারকে জানালেন তিনি পুলিশের চাকরি পেয়েছেন। পরিবার অবাক, আবার গর্বিতও হলো। কিন্তু নিয়োগের শেষ ধাপ মেডিক্যাল টেস্ট দিতে এসে দেখা দিলো নতুন এক সংকট। ফি দেওয়ার মতো টাকা তাঁর হাতে ছিল না। সেই মুহূর্তে পরিবারের ভালোবাসা আর ত্যাগের পরিচয় মিলল আরিফের মা নিজের কানে থাকা দুল খুলে বিক্রি করলেন, ছেলের স্বপ্ন পূরণের জন্য। অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন আসে। সমস্ত বাধা-বিপত্তি জয় করে আরিফ হোসাইন বাংলাদেশ পুলিশের চাকরিতে যোগদান করেন। পরিবারের চোখে আনন্দাশ্রু, সমাজে সম্মান, আর নিজের অন্তরে স্বপ্ন পূরণের শান্তি এই সবকিছু মিলিয়েই তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।

এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ত্যাগ নয়, বরং প্রমাণ করে অভাব যত বড়ই হোক না কেন, স্বপ্ন আর ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো কিছুই মানুষকে থামাতে পারে না।

আজ আরিফ হোসাইনের জীবন আমাদের শেখায় স্বপ্ন পূরণের জন্য অর্থ নয়, দরকার অধ্যবসায় ও সততা। ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর কষ্ট সাময়িক, কিন্তু ইচ্ছাশক্তি মানুষকে অদম্য করে তোলে। একজন মায়ের ভালোবাসা আর ত্যাগ সন্তানের সাফল্যের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।

আরিফ হোসাইনের এই গল্প শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রামের নয়, বরং এটি একটি প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার বাতিঘর। বর্তমানে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপির) পুলিশ লাইন্সে নায়েক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।দায়িত্ব পালনের পথে আরিফ পেয়েছেন প্রশংসা, সম্মাননা ও পদোন্নতি। তবে তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন হলো সাধারণ মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা।
বেতনের একটা অংশ তিনি মানবিক কাজে ব্যয় করেন। ২০১৮ সাল থেকে নগদ অর্থ, খাবার, শীতের কাপড়, রক্ত দান, রমজানে সেহরি ইফতার মিলে অসংখ্য অসহায় মানুষের কাছে তাঁর মানবিক সহযোগিতা পৌঁছে দিয়েছেন। আরিফ হোসাইন এর মানবিক সহায়তা পাওয়া এক বৃদ্ধ বলেছিলেন, “পুলিশকে আগে ভয় পেতাম, কিন্তু আরিফকে দেখে বুঝেছি পুলিশ আসলেই মানুষের বন্ধু।” এই একটুকু স্বীকৃতিই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

পুলিশ জনগণের বন্ধু। আরিফ হোসাইন তাঁর প্রকৃত উদাহরণ। শুধু মানবিক সহযোগিতা নয়, একজন ‍পুলিশ সদস্য হিসেবেও তিনি সেবা গ্রহীতাদের সহযোগিতা করে থাকেন।

আজ তিনি কেবল একজন পুলিশ অফিসার নন, তিনি অনেক তরুণের অনুপ্রেরণার প্রতীক। তার গল্প শেখায় “কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়, যদি থাকে বিশ্বাস, পরিশ্রম আর ধৈর্য।”

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Welcome Back!

Login to your account below

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.