বোমা বিস্ফোরণের মতোই এক আতঙ্কের নাম মেঘ বিস্ফোরণ। সম্প্রতি ভারতের কাশ্মীর, চীনের বেইজিং এবং হংকং-এ ঘটে যাওয়া মেঘ বিস্ফোরণ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কেন একে বিস্ফোরণ বলা হয়, কিভাবে ঘটে এই বিস্ফোরণ এবং প্রতিকার কী—এসব প্রশ্ন এখন মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যায় জানা যায়, বাতাসের আর্দ্রতা বেড়ে গেলে তা উপরে উঠে এবং জলীয় বাষ্পে পরিণত হয়ে ঘনিভূত হয়। এক পর্যায়ে মেঘের কুণ্ডলী বায়ুর চেয়ে ভারী হয়ে তীব্র শক্তি নিয়ে নিচে নেমে আসে, তখনই ঘটে মেঘ বিস্ফোরণ। হংকং সিটি ইউনিভার্সিটির প্রফেসর জনি চ্যানের ভাষায়, সাধারণভাবে মেঘ বিস্ফোরণ হলো বৃষ্টির বিস্ফোরণ। একে বিস্ফোরণ বলা হয় কারণ অল্প সময়ের মধ্যে মেঘ ভেঙে আকাশ থেকে অতিরিক্ত পরিমাণে বৃষ্টি ঝরে পড়ে। পুরো প্রক্রিয়া মাত্র ১০ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যেই ঘটে যায়। এটি বজ্রপাতের মতোই এক ধরনের প্রাকৃতিক ঘটনা। যখন বাতাসের আর্দ্রতা ও উষ্ণতা বেড়ে যায় তখন তা আকাশে উঠে বরফে পরিণত হয় এবং পরবর্তীতে পানি হয়ে মাটিতে নেমে আসে—এই প্রক্রিয়াকেই বলা হচ্ছে মেঘ বিস্ফোরণ। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চল এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, সেখানকার ভূখণ্ড থেকে বাতাস উপরে উঠতে গিয়ে পাহাড়ের সঙ্গে ধাক্কা খায় এবং দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হতে বাধ্য হয়। একে বলা হয় ওরোগ্রাফিক ফোর্সিং। এই প্রক্রিয়ার ফলে তীব্র ঝড় সৃষ্টি হয় এবং ভারী বর্ষণ ঘটে। এর প্রতিরোধে গাছের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বন উজাড় ও গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে।
সাম্প্রতিক ঘটনা ও বাংলাদেশে প্রেক্ষাপট
সম্প্রতি মেঘ বিস্ফোরণের ভয়বহ ঘটনা ঘটেছে পাকিস্তান ও ভারতে। বাংলাদেশে বড় আকারে নথিভুক্ত মেঘ বিস্ফোরণের ঘটনা নেই। তবে পাহাড়ি এলাকায় স্বল্প সময়ের প্রবল বৃষ্টিপাত প্রায়ই হয়, যা ছোট আকারে মেঘ বিস্ফোরণধর্মী পরিস্থিতি তৈরি করে। গত বছরের আগস্টে বাংলাদেশে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় অন্তত ৭১ জন মারা যান। এতে ৫৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশ সমতলভূমি হওয়ায় এখানে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। তবে পাহাড়ি চট্টগ্রাম এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় এমন ঘটনার আশঙ্কা থেকে যায়। সাধারণত পাহাড়ি অঞ্চল, নদীর উৎস বা হিমবাহের কাছাকাছি এলাকা এবং সংকীর্ণ উপত্যকা ও অপ্রশস্ত নদীপথে হঠাৎ জমে থাকা জলীয়বাষ্প একসঙ্গে নেমে আসার সুযোগ থাকে।
পূর্বাভাসের ব্যবস্থা আছে কি?
পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে সাধারণত স্বল্পমেয়াদী বৃষ্টিপাত অনুমান করা হয় নাও কাস্টিং নামক পদ্ধতিতে। তবে এ ধরনের হঠাৎ ভারী বর্ষণের সঠিক পূর্বাভাস দেওয়াকে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
মেঘের বিস্ফোরণ কোনো সাধারণ বর্ষণ নয়—এটি মুহূর্তের মধ্যে পাহাড়ি বা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে। দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রতিক প্রাণহানির ঘটনা আমাদের সতর্ক করে দিচ্ছে। বাংলাদেশে এখনো বড় আকারে এমন ঘটনা না ঘটলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ঝুঁকি ভবিষ্যতে বাড়তে পারে। তাই এই বিষয়ে সচেতনতা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়া জরুরি।
